কাদম্বিনী গাঙ্গুলি প্রথম বাঙালি নারী গ্র্যাজুয়েট

আমাদের ডেস্ক | প্রকাশিত: ২৫ ডিসেম্বর ২০১৭ ২২:৪৪

 কাদম্বিনী গাঙ্গুলি প্রথম বাঙালি নারী গ্র্যাজুয়েট

জোবায়ের আলী জুয়েল 

বাংলায় নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনকারী প্রথম কলেজ হলো বেথুন কলেজ। হিন্দু ফিমেল স্কুল হিসেবে প্রথম এর কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বিদ্যালয়টি শ্রী বৃদ্ধি ঘটে এবং ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দের ৭ মে এর নামকরণ হয় বেথুন স্কুল। বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা জন ইলিয়ট ড্রিন্ক ওয়াটার বেথুন (১৮০১-১৮৫১ খ্রি.) ছিলেন ট্রিনিটি কলেজ কেম্ব্রিজের গ্রাজুয়েট ও চতুর্থ র‌্যাঙ্গলার। তিনি গর্ভণর জেনারেলের কাউন্সিলের আইন উপদেষ্টা হিসেবে ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিলে ভারতে আসেন। তিনি কাউন্সিল অব-এডুকেশনেরও সভাপতি ছিলেন। নারী শিক্ষার অগ্রগতির ক্ষেত্রে তাঁর অগ্রণী ভূমিকা ও পদক্ষেপে তিনি রামগোপাল ঘোষ, রাজা দক্ষিণারঞ্জণ মুখার্জী, পÐিত মদন মোহন তর্কালঙ্কার প্রমুখের ন্যায় কতিপর্য ভারতীয় মনীষীর সমর্থন ও সহযোগিতা লাভ করেন। কলকাতা মির্জাপুরের রাজা দক্ষিণারঞ্জন মুখার্জীর দানকৃত জমিতে মাত্র একুশ জন ছাত্রী নিয়ে বেথুন স্কুলের কার্যক্রম শুরু হয়। ১৮৫১ খ্রিষ্টাব্দের ১২ আগস্ট বেথুন মৃত্যুবরণ করেন এবং ভারতের তৎকালীন গর্ভণর জেনারেল লর্ড ডালহৌসী বেথুন স্কুলের অগ্রগতি অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা নেন। কর্ণ ওয়ালিস স্কোয়ারের পশ্চিম দিকের একটি নতুন ভবণে বিদ্যালয়টি স্থানান্তরিত হয়। কলকাতার অপর একটি প্রধান মহিলা স্কুল বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়ের সঙ্গে একত্রীকরণের ফলে বেথুন স্কুলের অগ্রগতি দ্রততর হয়।
১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে বাঙালির ইতিহাসে একটি মাইলফলক। এ বছর জন্মগ্রহণ করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এ সময় প্রকাশিত হয় মাইকেল মধুসুদন দত্তের বাংলা সাহিত্যের একমাত্র সার্থক মহাকাব্য “মেঘনাথ বধ”। আর ওই বছরে ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ১৮ জুলাই জন্ম গ্রহণ করেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম বাঙালি নারী গ্রাজুয়েট ও চিকিৎসক কাদম্বিনী গাঙ্গুলি। ঊনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলার নারী শিক্ষা আন্দোলনের অন্যতম সক্রিয় সমর্থক ব্রজ কিশোর বসুর কন্যা কাদম্বিনী। ওই সময় প্রাথমিক অবস্থায় পুরুষের মতো জ্ঞানার্জন ও অধ্যয়নের সুযোগ লাভকারী নারীদের অন্যতম ছিলেন তিনি। তাঁর পিতা ব্রজ কিশোর বসু ছিলেন নারী শিক্ষার একজন অত্যুৎসাহী সমর্থক। ঊনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে নারী শিক্ষা বাংলার “ব্রাহ্ম সমাজ” এর সদস্যদের মধ্যে এক তীব্র বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছিল। কেশব চন্দ্র সেন (১৮৩৮-১৮৮৪ খ্রি.) নারীদের উচ্চ শিক্ষার বিরোধী হওয়ায় শিবনাথ শাস্ত্রী, দূর্গা মোহন দাস, দ্বারকনাথ গাঙ্গুলীসহ অন্যান্য প্রগতিবাদী ব্রাহ্ম তাঁর সমালোচনা করেন। অনেক বিশিষ্ট ব্রাহ্ম পরিবার কেশব সেনের গোষ্ঠী ত্যাগ করে ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের সাধারণ “ব্রাহ্ম সমাজ” গঠন করেন। পূর্ণ গঠিত বেথুন স্কুল থেকে প্রথম বারের মতো মিস কাদম্বিনীয বসুকে ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য পাঠানো হয় এবং তিনি পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য কাদম্বিনী বসুর গভীর আগ্রহে সরকার একটি মহিলা কলেজ স্থাপনের বিকল্প পথ আবিষ্কার অথবা কোলকাতায় মহিলাদের একমাত্র সরকারী প্রতিষ্ঠান বেথুন স্কুলে ডিগ্রি পর্যায়ের শিক্ষাক্রম চালু করার উদ্যোগ নেয়। 
শুধুমাত্র কাদম্বিনী বসুকে ছাত্রী তালিকাভুক্ত করে ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে বেথুন কলেজের কার্যক্রম শুরু হয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে কাদম্বিনী বসু ও সরলা দাস মহিলাদের মধ্যে প্রথম প্রবেশিকা পরীক্ষা দেয়ার অনুমতি পান। কী কারণে যেন সরলা দাস পরীক্ষা দিতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত শুধু কাদম্বিনী বসু পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দ্বিতীয় বিভাগে এন্ট্রান্স পাস করেন (১৮৭৮ খ্রি.)। বাংলার প্রথম দু’জন মহিলা গ্রাজুয়েট কাদম্বিনী বসু (১৮৬১-১৯২৩ খ্রি.) ও চন্দ্র মূখী বসু (১৮৬৯-১৯৪৫ খ্রি.)। ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার বেথুন কলেজের ছাত্রী হিসেবে কাদম্বিনী বসু বিএ পরীক্ষায় অংশ নেন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। তখন তাকে বাংলার প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে অভিনন্দিত করা হয়। অবশ্য ঐ একই বছর বেথুন কলেজ থেকে আরেকজন ছাত্রী বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি হলে উত্তর প্রদেশের বাঙালি মেয়ে চন্দ্রমুখী বসু। তারাই ছিলেন ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যের প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েট। ¯œাতক ডিগ্রি লাভের পর কাদম্বিনী সিদ্ধান্ত নেন মেডিকেল পড়ার। নারী শিক্ষার অত্যুৎসাহী সমর্থক পিতা ব্রজ কিশোর বসু সানন্দে কন্যার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। 
প্রথম নারী গ্রাজুয়েট কাদম্বিনী ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে দ্বারকনাথ গাঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং ঐ বছরই কোলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে একাগ্রচিত্তে পড়াশোনা শুরু করেন। তবে মেডিসিন পরীক্ষায় অকৃতকার্যতার জন্য এমবি উপাধি পাননি। অধ্যক্ষ তাঁকে গ্রাজুয়েট অব বেঙ্গল মেডিকেল কলেজ জিবিএমসি উপাধি দেন। ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে কাদম্বিনী বসু ইংল্যান্ডে যান এবং পরে খ.জ.ঈ.চ (এডিনবরা) খ.জ.ঈ.ঝ (গøাসগো) এবং উ.ঋ.চ.ঝ (ডাবলিন) উপাধি নিয়ে দেশে ফেরেন। কিছু দিন তিনি ডাফরিণ হাসপাতালে ডাক্তারী করেন। পরে স্বাধীন ব্যবসা শুরু করেন। সুবক্তা হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের তিনি প্রথম নারী বক্তা। 
কাদম্বিনী বসুর সঙ্গে মেডিকেল কলেজ আরও দু’জন মেয়ে ডাক্তারি পড়তেন। তাঁরা হলেন ভার্জিনিয়া মেরী মিত্র ও বিধুমুখী বসু। ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত প্রথম এমবি পরীক্ষায় ভার্জিনিয়া প্রথম স্থান অধিকার করেন। বিধুমূখীও এমবি পরীক্ষায় পাশ করেন। এই এম,বি পরীক্ষায় কাদম্বিনী বসু (১৮৬১-১৯২৩ খ্রি.) অকৃতকার্য হন। তারপরও কর্তৃপক্ষ তাঁর গ্রাজুয়েট অব বেঙ্গল মেডিকেল কলেজ (জিবিএমসি) ডিগ্রি দেন। এটি পাওয়ার পর তিনিই হন প্রথম ভারতীয় ডিগ্রিপ্রাপ্ত নারী চিকিৎসক। তিনি প্রথম বাঙালি নারী চিকিৎসক হিসেবে ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে মাসিক তিন’শ টাকা বেতনে যোগ দেন লেডি ডাফরিণ মহিলা হাসপাতালে। 
হিন্দু সমাজের রক্ষণশীল এক অংশ তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা শুরু করে। তিনি একই সঙ্গে চিকিৎসক ও সফল স্ত্রী এবং দায়িত্বশীল মাতার ভূমিকা অত্যান্ত সফলভাবে পালন করলেও ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে সনাতনপন্থী সাময়িকী “বঙ্গবাসী” তাঁকে পরোক্ষভাবে “আঘাত” করে। কাদম্বিনী এ সাময়িকীর সম্পাদক মহেশ চন্দ্র পালের বিরুদ্ধে মানহানি মামলায় জয়লাভ করে ছিলেন এবং সম্পাদককে ১০০ টাকা জরিমানা ও ছয় মাসের কারাদÐ দেয়া হয়েছিল। 
কাদম্বিনী চিকিৎসক হিসেবে তার দায়িত্বের মধ্যে সামাজিক জনসেবা ও রাজনৈতিক কর্মকাÐ যুক্ত করেন। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে কোলকাতায় অনুষ্ঠিত মহিলা সম্মেলনে তিনি ছিলেন অন্যতম সংগঠক। দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রান্স ভালের সত্যাগ্রহী শ্রমিকদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি কোলকাতায় এক সভার আয়োজন ও তাতে সভাপতিত্ব করেন। চা বাগানের নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছেন। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে গান্ধী কোলকাতায় এলে তাঁর সম্মানে কোলকাতায় “সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজ” আয়োজিত এক সভায় কাদম্বিনী সভাপতিত্ব করেন। 
সমাজসেবক রাজনীতিক ও প্রথম বাঙালি নারী গ্রাজুয়েট ও প্রথম বাঙালি নারী চিকিৎসক কাদম্বিনী গাঙ্গুলী ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ৩ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। 
তাঁর প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে পরবর্তী সময়ে অনেক বাঙালি মেয়ে মেডিকেল কলেজে লেখাপড়া করেছেন।

 

আরও পড়ুন...