৭৫ এর পঁচাত্তর লাইন

আমাদের প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ২৩ আগস্ট ২০১৭ ১৩:০৪

৭৫ এর পঁচাত্তর লাইন


----সাইফ আলী
শোন বন্ধু, আমার পাশে একটু দাঁড়াও। দু’টো কথা আছে-
আমি রাসেল বলছি- এদেশ তোমার, আমারও 
আমাকে কী অধিকার দিলে?
আমার বয়স তখনও তো বারো নয়!
কী অপরাধ করেছিলাম?
আমার বাবা- তোমরা যাকে বঙ্গবন্ধু বলো, 
তোমাদের স্বাধীনতা এনে দিতে জীবন বাজি রেখেছিলেন-
তাঁর জীবনের অর্ধেকটা সময় কেটেছে কারাগারে।
আমি তাঁরই আদরে- আদর্শে অনুপ্রাণিত, বিধায়
আমার মাথায় বুলেট বিদ্ধ হয়ে ওভাবেই চিরবিদায় নিতে হলো অবেলায়?

মা আমাকে আদর করে একখানা ছোট্ট সাইকেল কিনে দিয়েছিলেন,
-রাশিয়ান সাইকেল।
সেই সাইকেল চালিয়ে আমার তৃপ্তি মেটেনি; 
মনে হয়, যদি আরো কিছুদিন চালাতে পারতাম।
তোমরা কি জানো- সেটা এখন কোথায় আছে, কীভাবে আছে?
তোমাদের কাছে আছে? আমাকে একটু চালাতে দেবে?
আমি আবার তোমাদের ফিরিয়ে দেব- একটু চালাতে দেবে?

বন্ধু আমার, জানো?
বাবার আদর খুব একটা পেলাম না-
তিনি আমার শৈশবের দিনগুলোতে প্রায় কারাগারেই থাকতেন।
তোমাদের কি বাবা আছে, তোমাদের খুব আদর করেন,
চকলেট, ঘুড়ি, বল-ব্যাট কিনে দেন?

আমাকে কি তোমরা চিনতে পেরেছ?
ধানমন্ডির ৩২ নম্বর থেকে রাসেল বলছি।
কামাল ভাই, জামাল ভাই এবং ভাবীদের সাথে খুব মজা করতাম,
দুষ্টুমি করতাম, তাঁরা আদর করে আমার গাল টেনে দিতেন
রাতের বেলায় মায়ের বুকে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে যেতাম।

হঠাৎ একদিন ভোরবেলা আমাদের ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িটিতে
শুনতে পেলাম গুলির শব্দ, আমি কতকটা ভয়ে নিঃশব্দে, নিভৃতে 
মাকে জাপটে ধরে তাঁর বুকের সাথে জড়িয়ে রইলাম।
ক্রমেই গুলির শব্দ বাড়তে লাগল, মা আমাকে রেখে এগিয়ে  গেলেন,
তারপর মুহূর্তেই ঘটে গেল যে ঘটনা-
-তোমরা তার সব জানো।

রক্তের বন্যা বইছিল আমাদের বাড়ির সিঁড়ি ভেঙে।
আমার মায়ের বুলেটবিদ্ধ রক্তাক্ত লাশ দেখেছি।
বুকের ভিতরে চিনচিন করে ব্যথা করে ওঠে।

কামাল ভাই, জামাল ভাইকে দেখেছি লাশ হয়ে 
ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকতে। গুলির আঘাতে-
তাদের দেহ থেকে গল গল করে রক্ত ঝরে গড়িয়ে পড়ছে।
ভাবিদের এবং অন্যান্যের রক্তের সাথে মিশে হয়ে যাচ্ছে একাকার।
কোন রক্ত কার আমি বুঝতে পারছিলাম না।

রক্ত আর লাশ দেখে আমি হয়ে গিয়েছিলাম কিংকর্তব্যবিমূঢ়।
তাদের প্রত্যেকের দেহে কতগুলো করে বুলেট বিদ্ধ হয়েছিল-
ওই খবর কি তোমাদের জানা আছে, বন্ধু?
আমার মায়ের বুলেটবিদ্ধ রক্তাক্ত লাশ দেখেছি।
বিশ্বাস হয়নি সেসব দৃশ্য, মাকে ডেকে তুলতে চেয়েছি। 
বলেছি, মা, ওমা- ওঠো। তোমার কী হয়েছে- উঠছো না কেন,
কী হয়েছে তোমার- ওঠো-
বলে বলে কত কেঁদেছি, কত ডেকেছি; কিন্তু মা আমার ওঠেননি।
বাবার দিকে তাকিয়ে দেখেছি- 
তাঁর বুকটা বুলেটে একেবারে ঝাঁজরা হয়ে গেছে,
নিঃশব্দে তিনি পড়ে আছেন সিঁড়িতে।
আমাদের বাড়িভরা আরো কত লাশ, 
আরো কত রক্ত দেখেছি সেদিন।
এতসব অবিশ্বাস্য কষ্ট ও কঠিন ঘটনার দৃশ্য দেখার জন্যই কি
আরো কিছু সময় আমাকে বেঁচে থাকতে হয়েছিল?
বুক ভেঙে খান খান হয়ে গিয়েছিল সেদিন; 
কিন্তু সে জ্বালায় বেশিক্ষণ জ্বলতে হয়নি।
মায়ের কাছে যেতে চেয়েছি। দু’চোখের সামনে দেখতে পেলাম 
আমার দিকে বন্দুকের নল তাক করে ধরেছে কেউ একজন,
তখন আমি আমার অপরাধ খুঁজতেছিলাম এবং ভাবতেছিলাম... ফের ভাবতেও সময় পেলাম না, 
হঠাৎ করে আমার মাথায় একটি বুলেট এসে বিদ্ধ হলো,
গুলির প্রচ- শক্তিতে পিছনের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লাম। 
আমার মাথা থেতলে গেল। 
সে যে কী নিদারুণ কষ্ট! কত যে ছটফট করলাম অসহ্য যন্ত্রণায়;
তারপর আর কিছুই মনে নেই- জানি না।
তোমরা অনেকক্ষণ থেকে শুধু আমার কথা শুনছো
আমি তোমাদের কাছে শুধালাম- 
আমার অপরাধের কথা কেউ বলতে পারল না।
দিব্যি করে বলছি- সে কথা আমিও জানি না। 
তোমরা কখনো জানলে আমাকে জানিও; আর 
তোমাদের হৃদয়ে যদি ভালোলাগা থাকে আমার জন্য,
অবশেষে একটু মমতা দিয়ে ধন্য করিও।

আরও পড়ুন...