তাপমাত্রা বৃদ্ধিই বজ্রপাতের কারন, মোবাইল নয়

| প্রকাশিত: ২৮ আগস্ট ২০১৭ ২২:০৩

তাপমাত্রা বৃদ্ধিই বজ্রপাতের কারন, মোবাইল নয়


দেলোয়ার হোসেন মহিন //
মোবাইল ফোন ব্যবহারের ফলে বজ্রপাত হচ্ছে এমন একটি গুজব সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু বজ্রপাতের জন্য তাপমাত্রাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। 
অপরদিকে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি আর জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণেই বাড়ছে বজ্রপাত। তাপমাত্রা যত বাড়বে বজ্রপাত তত বাড়বে। তবে এর সঙ্গে মোবাইল ফোন ব্যবহারের কোনো সম্পর্ক নেই। আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০১৪ সালে সারা দেশে ৯১৮টি বজ্রপাত আঘাত হেনেছিল, ২০১৫ সালে ১ হাজার ২১৮টি, ২০১৬ সালে তা দেড় হাজার ছাড়িয়ে গেছে। তবে একটু সচেতন হলেই বজ্রপাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব বলে মনে করেন আবহাওয়াবিদরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান ড. এইচ এম আসাদুল হক বলেন, 'ধাতব বা বিদ্যুৎ পরিবাহীর উপরই বজ্রপাত হয়। মোবাইলে যতটা ধাতব পদার্থ থাকে তাতে বজ্রপাতের কোন কারণ নেই। বরং মোবাইল ফোনের টাওয়ারের কারণে বজ্রপাতে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি কমেছে। কারন মোবাইল ফোনের টাওয়ার থাকলে বজ্র সরাসরি টাওয়ারের উপর পড়ে। টাওয়ারে বজ্র নিরোধক ব্যবস্থা থাকায় বিদ্যুৎ মাটিতে চলে যায়, ক্ষয়ক্ষতি না ঘটিয়ে। 
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণ আরও একটি নতুন আশঙ্কার কথা বলছে। এত দিন দেশের বজ্রপাতগুলো মূলত সিলেট-কিশোরগঞ্জ-নেত্রকোনার হাওর এলাকায় হতো। সেখানে বেশির ভাগই জলাভূমি ও জনবসতি কম হওয়ায় মানুষের মৃত্যুর হার ছিল অপেক্ষাকৃত কম। কিন্তু গত অর্ধযুগে পর্যায়ক্রমে দেশের মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলোতে বজ্রপাত বাড়ছে। বিশেষ করে ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, রাজবাড়ী এলাকায় বজ্রপাত বেড়ে গেছে। এসব জেলায় জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি হওয়ায় প্রাণহানির পরিমাণও বেড়ে গেছে।


আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ শামীম হাসান ভূঁইয়া বলেন, 'প্রাকৃতিক কারণেই বজ্রপাত হয়। জলাবায়ু পরিবর্তনের কারণে গত ৪০ বছরে বাংলাদেশের তাপমাত্রা শূণ্য দশমিক ৭ ডিগ্রি বৃদ্ধি পেয়েছে। তাপমাত্রা এক ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে ২০ শতাংশ বজ্রপাত বৃদ্ধি পায়। এ হিসেবে বজ্রপাত প্রায় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।'
আবহাওয়াবিদ এ আব্দুল মামুন জানান, 'রেকর্ড অনুযায়ী ১৯৮১ সাল থেকে বজ্রপাতের সংখ্যা বাড়ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণেই বজ্রপাত বাড়ছে। চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসের  তাপমাত্রা স্বাভাবিক গড় তাপমাত্রার চেয়ে বেশি। এ কারণে বজ্রপাতের সংখ্যাও বেশি।
আবহাওয়াবিদরা জানান, বজ্র সরাসরি মাটিতে পড়ে না। বিদ্যুৎ পরিবাহীর উপর পরে। এরপর পরিবহন পদ্ধতির মাধ্যমে বজ্রের বিদ্যুৎ মাটিতে চলে গিয়ে নিউট্রাল হয়ে যায়। উঁচু গাছ, ভবন, পাহাড় শীর্ষে বজ্রপতিত হয়। বাসা বাড়িতে লাগানো বজ্ররোধী তারের উপর পরে। 
ড. এইচ এম আসাদুল হক বলেন, মানুষের শরীর বিদ্যুৎ পরিবাহী। এ কারনে মানুষের উপর বজ্র পড়ে। যদি  কোন খোলাস্থানে বজ্র পড়ার মতো কোন বিদ্যুৎ পরিবাহী পদার্থ না থাকে আর সেখানে যদি মানুষ থাকে যার উচ্চতা অন্য বিদ্যুৎ পরিবাহীর চেয়ে বেশি তাহলে মানুষের উপর বজ্র পড়বে। খোলা মাঠে কেউ যদি ধাতব কোন বস্তু যেমন শাবল, কাস্লে, বা ধান মাড়াইয়ে কলে কাজ করেন তাহলে বজ্রপৃষ্ঠ হতে পারে। বজ্রপাত থেকে বাচাঁতে সতর্কতার বিকল্প নেই।
শামীম হাসান বলেন, বজ্রপাত থেকে বাঁচতে হলে মে মাসে যখন আকাশে বিজলি চমকাবে তখন খোলা আকাশের নীচে থাকা যাবে না। বজ্রপাতের সময় বড় গাছের নীচে দাড়ানো উচিত নয়। ভেজা কাঠ বিদ্যুৎ পরিবাহী। বড় গাছ এড়িয়ে বৃত্তাকারে এর ৪০ ডিগ্রী দহৃরে দাড়ানো উচিত। ফাঁকা স্থানে থাকলে বজ্রপাতের সময় উবু হয়ে বসে যেতে হবে। নৌকায় বা পানিতে থাকলে শুকনোস্থানে চলে যেতে হবে। গাড়ির চাকা বিদ্যুৎ কুপরিবাহী রাবারের তৈরি। সে কারনে গাড়ি নিরাপদ। বাসাবাড়িতে বজ্র নিরোধক তার সংযুক্ত করতে হবে নিরাপত্তার জন্য।
দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে দেশে বজ্রপাতে ১ হাজার ১৫২ জন মারা গেছে। এর মধ্যে গত বছর মৃত্যুর সংখ্যা সর্বোচ্চ, ২১৭ জন। চলতি বছরে ৪০ দিনে বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন ১৭৪ জন। তবে দুদিনেই বজ্রপাতে নিহত ৬৩ জন। এর মধ্যে গত তিন বছরে সুনামগঞ্জে মারা গেছে ৩৭ জন। চলতি বছরের তথ্য যোগ করলে এই সংখ্যা প্রায় ৫০ জন বলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর জানিয়েছে। অবশ্য বাংলাদেশ দুর্যোগ ফোরামের হিসাবে ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দেশে ১ হাজার ৫৮৯ জন বজ্রপাতের আঘাতে মারা গেছে।

আরও পড়ুন...