রাজধানীর জলাধারনের ক্ষমতা প্রায় দুই তৃতীয়াংশ কমেছে

| প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট ২০১৭ ২১:২৫

রাজধানীর জলাধারনের ক্ষমতা প্রায় দুই তৃতীয়াংশ কমেছে

ঢাকার মানচিত্র থেকে ‘নীল’ রঙ হারিয়ে যাচ্ছে


দেলোয়ার হোসেন মহিন
তিন দশকে রাজধানীর জলাধারনের ক্ষমতা প্রায় দুই তৃতীয়াংশ কমেছে। ১৯৭৮ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত, ৩০ বছরে ঢাকা মহানগর এলাকায় ১৮ দশমিক ৭২ বর্গকিলোমিটার নদ ও খাল কমেছে। জলাভূমি কমেছে ৭৬ দশমিক ৬৭ বর্গ কিলোমিটার। ঢাকার নদী, খাল ও জলাভূমির ৬৫ শতাংশই ভরাট হয়ে গেছে। এতে করে রাজধানী ঢাকার জলাভূমির অর্ধেকেরও বেশি গায়েব হয়ে গেছে ও একই সঙ্গে ঢাকার মানচিত্র থেকে ‘নীল’ রঙ হারিয়ে যাচ্ছে। 
২০০৯ সালে ‘প্রি এন্ড পোস্ট আরবান ওয়েটল্যান্ড এরিয়া ইন ঢাকা সিটি : বাংলাদেশ, এ রিমোট সেনসিং এন্ড জিআইএস অ্যানালাইসিস’শীর্ষক গবেষণা এই প্রতিবেদনে প্রকাশ করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনিষ্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. জি এম তরিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, তিনি ও তার সহকর্মীরা ‘জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম’ (জিআইএস) বিশেম্লষনের মাধ্যমে গবেষনা করেন। 
এ গবেষনায় ২০০৯ সাল নাগাদ তথ্য রয়েছে। গত আট বছরে পরিস্থিতি কতটা বদলেছে- এ প্রশ্নে অধ্যাপক তরিকুল ইসলাম বলেন, পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি। যদি উন্নতি হতো, তাহলে ঢাকায় জলজট হতো না। জলজট প্রমাণ করে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। কতটা খারাপ হয়েছে, তা সম্পর্কে তিনি বলেন, ২০০৯ সালের পর ঢাকার পূর্বাঞ্চলে নতুন আবাসিক এলাকার জন্য নিচু জমি ও জলাভূমি ভরাট হয়েছে। মিরপুর, কালশি এলাকায় বিস্তীর্ণ এলাকা ভরাট করেছে আবাসন কোম্পানিগুলো। 
সাতারকুল, বাড্ডা, মোহাম্মপুরের বছিলার নিম্নাঞ্চলও ভরাট করা হয়েছে অপরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য। অপরিকল্পিত উন্নয়নের উদাহরণ দিয়ে অধ্যাপক তরিকুল ইসলাম বলেন, পার্বত্যাঞ্চলে বন্যা ঠেকাতে ‘ই¯দ্বার্ন বাইপাস’এর নামে বাধ নির্মাণ করা হবে। এ প্রকল্প বাস্লবায়িত হলে, রামপুরা, বাড্ডা এলাকার পানি নামার কোন পথ থাকবে না। তিনি গবেষনার অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, ২০০৯ সালে ঢাকার আয়তনের ২১ ভাগ জলাভূমি টিকে ছিল। এখন তা আরও অনেক কম। 

সরকারি গবেষনা প্রতিষ্ঠান ইনিষ্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য মতে, ১৯৭৮ সালে ঢাকায় নদী ও খালের পরিমাণ ছিল ২৯ বর্গ কিলোমিটার। ২০১৪ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ২ বর্গ কিলোমিটারে। খাল ও নদীর মোট আয়তনের দুই তৃতীংশই ভরাট হয়ে গেছে। ১৯৭৮ সালে নিম্ন ও জলাভূমির পরিমাণ ছিল ১৩০ বর্গকিলোমিটার। ২০১৪ সালে তা কমে হয়েছে ৮১ দশমিক ৩৩ বর্গ কিলোমিটার। 
১৯৭৮ ঢাকার মোট আয়তনের ৫২ ভাগই ছিল নদী, খাল ও নিম্নভুমি। ২০০৯ সালের তথ্যানুযায়ী, ৩৫৩ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের রাজধানীর মোট আয়তনের মাত্র ২১ ভাগ ছিল  জলাভূমি। ৬৫ শতাংশ জলাভূমি কমেছে, তিন দশকে।
ইনিষ্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ১৯৭৮ সালে ঢাকায় জলাভূমির পরিমাণ ছিল ২৯ দশমিক ৫২ বর্গ কিলোমিটার। নিন্ম ভূমি ছিল ১৩৫ দশমিক ২৮ বর্গ কিলোমিটার। খাল ও নদী ছিল ২৯ বর্গ কিলোমিটার। ২০১৪ সালে জলা্ভূমি কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৩৫ বর্গ কিলোমিটারে। নিন্মভূমি দাঁড়িয়েছে ৬১ দশমিক বর্গ কিলোমিটারে। ওই বছর নদী ও খালের পরিমাণ ছিল ১০ দশমিক ২ বর্গ কিলোমিটার। এ হিসেবে ২০০৯ সালের পর পরবর্তী পাঁচ বছরে খাল, বিল ও জলাভূমি কমেছে প্রায় পাঁচ শতাংশ। এ হার অব্যহত থাকলে, ২০৩১ সাল নাগাদ ঢাকায় জলাভূমি ১০ শতাংশের নীচে নেমে আসবে বলে সতর্ক করা হয়েছে ইনিষ্টিদ্বটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের প্রতিবদনে। 
গবেষনা প্রতিষ্ঠানটি নির্বাহী পরিচালক অধ্যপক ড. এম মনোয়ার হোসাইন বলেন, ঢাকায় যে প্রতিদিন জলাভূমি কমছে, খাল, বিল, নদী ভরাট হচ্ছে তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই, কোন গবেষনারও দরকার নেই। খালি চোখেই দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিন সব খাল দখল হয়ে গেছে, নদী ভরাট হচ্ছে। নিচু ও জলাভূমি ভরাট করে ভবন তোলা হচ্ছে। 
খাল ও নদী উদ্ধারে ২০১০ সালে ছয়টি মন্ত্রণালয়কে নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে সরকার।  এরও আগে খাল ও নদী দখলকারীদের চিহ্নিত করা হয়। ১০ হাজারের বেশি দখলদারের তালিকা করা হয়। কয়েক দফা উচ্ছেদ অভিযানও চালানো হয়। অভিযানের কয়েকদিনের মধ্যেই দখল আগের রুপ নেয়। প্রতি বর্ষায় রাজধানীতে জলাবদ্ধতায় ভুগতে হয় নগরবাসী। জলজট সৃষ্টি হলে সরকারের তরফ থেকে তাৎক্ষনিক আশ্বাস দেওয়া হয়, খাল নদী দখলমুক্ত করা হবে। বর্ষার পর, তা সবাই ভুলে যান। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাছের খান বলেন, এ দুষ্টু চক্রে আটকা পড়েছে জলাভূমি উদ্ধার কার্যক্রম।   
ঢাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে ঘণ্টায় ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিতে শহরের প্রধান সড়ক তলিয়ে যাচ্ছে। গত বুধবার সকাল ছয় থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত, ছয় ঘণ্টায় মাত্র ৫৬ মিলিমিটার বৃষ্টিতে শহরের প্রায় সব প্রধান কয়েক ঘণ্টার জন্য ডুবে যায়। যদিও ঢাকা ওয়াসার দাবি, ঘণ্টায় ১৫ থেকে ২০ মিলিমিটার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা রয়েছে তাদের ড্রেনেজ ব্যবস্থার। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হকের অভিমত ওয়াসার সক্ষমতার দাবি কাগুজে। সংস্থাটির পানি নিষ্কাশনের ততটা ক্ষমতা নেই, যতটা তারা দাবি করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কিউ এম মাহবুব জানান, বৃষ্টির পানি তিনটি উপায়ে নিষ্কাশিত হয়। পানির একটি অংশ মাটি শুষে নেয়। আরেকটি অংশ জলাধারে জমা হয়। বাকী অংশ খালের মাধ্যমে নদীতে চলে যায়। কিন্তু রাজধানীতে খোলা মাটির পরিমাণ খুবই নগন্য। টপ সয়েল (খোলা জমি) কংক্রিটে ঢাকা পড়ায় মাটি পানি শোষণ করতে পারছে না। বিল ও নিম্নাঞ্চল ভরাট হওয়ায় পানি ধারনের জায়গা নেই। খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি নদীতেও নামতে পারছে না।

আরও পড়ুন...