কোনকিছুই থামছে না; যেন থামানোর কেউ নেই

অনলাইন ডেস্ক | প্রকাশিত: ১৫ মার্চ ২০১৮ ১৬:০১

কোনকিছুই থামছে না; যেন থামানোর কেউ নেই

-ফজলে এলাহী আরিফ

সম্ভবত আমি প্রতিক্রিয়াহীন হয়ে গেছি! কোন কিছুতেই এখন আর কষ্ট পাই না; মন খারাপ করি না। কোন দুর্ঘটনা কিংবা মৃত্যু সংবাদ শুনলে, শুধু পাঠ করি “ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন”। তাই নেপালের কাঠমান্ডুতে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে কমপক্ষে ৫০ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় তেমন কষ্ট পাইনি; আরো কষ্ট পাইনি চট্টগ্রামের হাটহাজারীর নয় বছর বয়সী শিশু ধর্ষণ ও হত্যা চেষ্টার ঘটনায় কিংবা প্রফেসর জাফর ইকবালের উপর হামলায় কিংবা পুলিশ হেফাজতে এক রাজনৈতিক কর্মীর মৃত্যুতে। তবে এখনো অমানবিক হয়ে যাইনি। আবেগ কমে গেলেও, এখনো অনেক মানবিক গুণাবলী আমার মধ্যে অবশিষ্ট আছে। আমাদের হর্তা-কর্তা থেকে শুভাকাঙ্খী; সবাই আমাদেরকে অনেক স্বপ্ন দেখান, সাহস দেন; তবুও নির্ভর করতে পারি না। যতক্ষণ না বাস্তবে দেখতে পাই, ততক্ষণ বিশ্বাসই হয় না। কেউ নিজেকে আমার সুহৃদ বা শুভাকাঙ্খী বললেও, নির্ভার হতে পারি না।

একেকটি সুনির্দিষ্ট দুর্ঘটনার জন্য আমি কেন মন খারাপ করব, কেন কষ্ট পাব? দুর্ঘটনার আকার বড় হলে, মন খারাপ করতে হয়? যেকোন দুর্ঘটনা বা মৃত্যুর ফলাফল তো একই রকমের। প্রায় প্রতিদিনই আমরা শুনতে পাই- ধর্ষণ, শিশু হত্যা, খুন, ক্রস ফায়ার, গুম, পরিবহন দুর্ঘটনা, আগুন লাগা, ভবন ধস, গণপিটুনি, পারিবারিক কলহ, সামাজিক অসন্তোষ, আত্মহত্যা, রাজনৈতিক সংঘাত ও অন্যান্য সহিংসতার ঘটনার খবরাখবর। সকল দুর্ঘটনাগুলো যেন রুটিনমাফিক ঘটে যাচ্ছে; কোনকিছুই থামছে না; যেন থামানোর কেউ নেই। সকল ধরনের দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে, বেওয়ারিশ লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। আরো নানাভাবে মানুষ মরছে। ছোটবেলায় অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যুঘটিত লাশের কথা ভাবলে ভয়ে রাতে আমার ঘুম আসত না। এখন আর ভয় পাই না; ঘুম থেকে জেগে উঠি লাশের সংবাদ শুনে আর ঘুমাতে যাই লাশের সংবাদ শুনে। তাই এখন আমার মন খারাপ হয় না।

কত ঘটনাই তো আছে মন খারাপ করার মত। কিন্তু আমরা কয়টি কারণে মন খারাপ করি? নতুন একটি দুর্ঘটনা ঘটলে, আমরা আগের দুর্ঘটনাটি বেমালুম ভুলে যাই, যেন আগে কখনোই এমন দু:খজনক দুর্ঘটনা ঘটেনি। রাজধানীর বাড্ডার পৌনে চার বছর বয়সী শিশু, গাজীপুরের শ্রীপুরের ছয় বছর বয়সী শিশু, নাটোরের গুরুদাসপুরের সাত বছর বয়সী শিশু, কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের আট বছর বয়সী শিমু, চট্টগ্রামের আকবার শাহ এলাকার নয় বছর বয়সী শিশু, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের দশ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী রোকসানা, ভোলার লালমোহনের এগারো বছর বয়সী সাথী, যশোরের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী, কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের তনু, বরিশাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি কলেজের ছাত্রী সাদিয়া, নারায়নগঞ্জের ফতুল্লার স্কুলছাত্রী মোনালিসা, টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে রূপা, ররগুনার অজ্ঞাত তরুণী, রাজবাড়ীর মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা! আরো আছে ভবন ধস ও আগুনে পুড়ার ঘটনা! আগুনে মিরপুর ১২ নম্বরের বস্তির ৫০০০ ঘর পুড়ে ছাই হয়েছে, সাভারের রানা প্লাজা ধসে ১১৭৫ জন শ্রমিক, তেজগাঁও এলাকার বেগুনবাড়িতে ভবন ধসে ২০ জন, সাভারের পলাশবাড়ীতে স্পেকট্রাম গার্মেন্টসের ভবন ধসে ৩৮ জন শ্রমিক, আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনে ১২৬ জন শ্রমিক, কাশিমপুরের মাল্টি ফ্যাবস লিমিটেডে বয়লার বিস্ফোরেণ ১১ জন শ্রমিক, পূবাইলের এক টায়ার কারখানায় আগুনে ৫ জন, গাজীপুর সদরের গরীব অ্যান্ড গরীব সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে আগুনে ২১ জন শ্রমিক মারা গিয়েছে। বাস ও লঞ্চ দুর্ঘটনা তো আছেই। আর অন্য অনেক জ্ঞাত-অজ্ঞাত মৃত্যু তো আছেই। অনেক সম্মানিত ও গুণী ব্যক্তির অসম্মান নিয়ে না-ই-বা কিছু বললাম!

ইদানিং কোন দুর্ঘটনা ঘটলেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শোক পালনের হিড়িক পড়ে যায়; প্রোফাইল পিকচার কালো, প্রোফাইল পিকচার পরিবর্তন, ব্যথিত হওয়ার কান্না কান্না পোস্ট, আরো কত কি! আর নিজের মতের অনুসারী কিংবা পক্ষের কারো কোন দুর্ঘটনা হলে তো কোন কথাই নেই; সবাই যেন বেদনায় নিকষ কালো হয়ে যায়। আর বিপরীত মত বা পক্ষের কারো কোন দুর্ঘটনা বা ক্ষতি হলে, তেমন সমস্যা নেই। কিন্তু আমার ন্যায় মধ্যম মত বা পক্ষের লোকদের কষ্ট কম হয়; আমরা যেন সারাক্ষণ কালো চশমা পড়ে ঘুরে বেড়াই। অধিকাংশের মত আনুষ্ঠানিক শোক পালন করতে চাইলে, আমার ন্যায় মধ্যম মত বা পক্ষের লোকদের উচিত নিজের বাড়ী, গাড়ী, স্ত্রী, সন্তান সর্বক্ষেত্রে কালো রঙ বা চাদরে ঢেকে দিয়ে শোক পালন করা। সর্বক্ষণ কালো দেখতে দেখতে শোকে বিহ্বল হয়ে থাকব!

এত বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটে, এত মানুষ মরে; অথচ কোন শাস্তি হয় না, কোন প্রতিকার পাওয়া যায় না। আমরা এমন এক জাতিতে পরিণত হয়েছি যার সবকিছু ভাল, শুধু চরিত্রটা খারাপ! আমরা ব্যথিত হতে চাই না, আমরা কালো ব্যাজ ধারণ করতে চাই না; আমরা প্রতিটি অনাচারের শাস্তি চাই, প্রতিটি অপরাধের প্রতিকার চাই। আমরা যেমন স্বাভাবিক জীবনের গ্যারান্টি চাই, তেমন স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টিও চাই।

বি: দ্র: মতামত লেখকের নিতান্তই ব্যাক্তিগতযা দায় কোন ভাবেই কর্তৃপক্ষের উপর বর্তায় না।