এক হাত আর এক পায়ে টেনে নিচ্ছেন চার সদস্যের সংসার

আমাদের প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ৩০ অক্টোবর ২০১৮ ১৯:৫৩

এক হাত আর এক পায়ে টেনে নিচ্ছেন চার সদস্যের সংসার

এক হাত আর এক পায়ে টেনে নিচ্ছেন চার সদস্যের সংসার। তাও তিন চাকায় ভর করে। নুরুল্লাহর বাড়ি জামালপুরে। ঘরে স্ত্রী। দুই সন্তান। দুজনই মেয়ে। বড় মেয়েটার বয়স আট বছর। প্রতিবন্ধত্ব তার জন্ম সহোদর। কথা বলতে পারে না। হাঁটতেও পারে না। বাঁ পা-টা ডান পায়ের তুলনায় চিকন।
চিকিৎসকরা বলেছেন, টানা কয়েক বছর থেরাপি দিলে হয়তো হাঁটতে পারবে মেয়েটি। দু হাত-পায়ে তিন চাকা টেনে চারজনের খাওয়া-পরার জোগান দিতেই বাবা নুরুল্লাহর গলদঘর্ম। তার ওপর মেয়ের এমন ব্যয়বহুল চিকিৎসা টেনে নেওয়া দুঃসাধ্যই বটে।

স্ত্রী-সন্তানরা গ্রামে থাকেন। নুরুল্লাহ থাকেন ঢাকার খিলগাঁওয়ে। মেসে। রিকশা চালান। এক যুগের বেশি সময় ধরে চলছে তার জীবনের এই যুদ্ধ। ভিক্ষাবৃত্তি নয়, আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচবেন বলেই নেমেছিলেন এই পথে।

নুরুল্লাহর আফসোস, তার এলাকার মানুষ জানেন না তার সংগ্রামের কথা। তারা ভাবেন তিনি বুঝি ভিক্ষা করেন। তাকে নিয়ে প্রতিবেদন করা হবে জানতে পেরে হাসিমুখে বলেন, ‘ভাই, তাড়াতাড়ি করেন। আমি এরারে দেখায়াম আমি ভিক্ষা করি না, কাজ কইরা খাই।’

কাজ করে পুরোপুরি স্বচ্ছলতা আনতে না পারলেও খেয়েপরে চলে যাচ্ছে জীবন। কিন্তু মেয়েটিকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দিতে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই তার। কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না।

ভোর থেকে রাত দশটা পর্যন্ত তিন চাকায় চষে বেড়ান রাজধানীর কঠিন পথ। কিছু সঞ্চয় ছিল। তা দিয়ে সাভারের সিআরপিতে মেয়েকে নিয়ে গিয়েছিলেন। চিকিৎসক বলেছেন, নিয়মিত বেশ কিছুদিন থেরাপি দিতে হবে। অর্থের অভাবে বন্ধ রয়েছে চিকিৎসা।

নিজের জীবনের গল্প বলছিলেন নুরুল্লাহ। রেলের কঠিন চাকা কোমল জীবনকে থমকে দিয়েছিল।

তখন কৈশোরে। শরীরের মতো জীবনটাও ছোট হয়ে এসেছিল যেন। বাঁ হাত-পা কাটা পড়েছিল রেলের চাকায়। বেঁচে ফিরবেন, ক্ষীণ আশা ছিল মনে। ছয়মাস হাসপাতাল শয্যা কাটিয়ে বাড়ি ফিরলেন কাঠের ক্রাচে ভর করে।

জামালপুরের অস্বচ্ছ পরিবারে জন্ম তার। নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। আয়ের বোঝা বাবার একার মাথায়। আট সদস্যের সংসারের বোঝা টানতে গিয়ে এখন-ত্যাখন অবস্থা। তার ওপর সন্তানের চিকিৎসা ব্যয় টানতে গিয়ে নুয়ে পড়েছিলেন।

একদিন এক পরশী বললেন, নুরুল্লাহকে ঢাকা নিয়ে যাবেন। কাজ দেবেন। বাবা-মায়ের মন সায় দিচ্ছিল না। এই অর্ধ শরীরে ছেলেটা কোথায় যাবে, কী করবেÑ এই ভাবনা ছিল মনে।

নুরুল্লাহ ভাবলেন, ‘এভাবে শুয়ে বসে থাকার চেয়ে যদি সত্যিই কিছু করা যায়। বাবার বোঝা হয়তো কিছুটা কমবে।’

পরশীর হাত ধরে ঢাকা এলেন নুরুল্লাহ। বলছিলেন, ‘গ্রামের এক লোক বললো ঢাকায় চল। কাজ দিমু। আমি আইলাম তার সঙ্গে। হেয় কইলো, ভিক্ষা করতে। যা টাকা পামু অর্ধেক হের অর্ধেক আমার। দু-একদিন করলাম এই কাজ। কিন্তু ভালো লাগতে ছিল না। কান্দন আইতো। তার লগে ক্যান আইলাম, মনে কইরা কানতাম। বুঝতাম, ভিক্ষা করন ভালো না। ছোট বইনের কথা মনে করতাম। ভাই ভিক্ষা করে শুনলে হের বিয়া হইব না। নিজেও বিয়া করতে পারমু না। বিয়ার আগে তো মানুষ জিগায় ছেলে কী করে। ভিক্ষা করে শুনলে কেউ মইয়্যা দিব না।’

একদিকে আত্মসম্মান, অন্যদিকে জীবিকা। ভাবনায় পড়ে গেছেন ১৫ বছরের কিশোর নুরুল্লাহ। সেই স্মৃতি মনে করে বলছিলেন, ‘চিন্তা করলাম, এহন তো বাড়িত যাওন যাইব না। ভিক্ষা বাদ দিলাম। ঠিক করলাম রিকশা চালামু। তখন তো পায়ে প্যাডেল দেওনের গাড়ি। গ্যারেজের মালিক কইলো পারবি? এক পাও এক হাত লইয়্যা কেমনে চালাবি? আমি কইলাম, কয়দিন গেলে ঠিক হইয়্যা যাইব।’

তারপর এক পায়ে প্যাডেল চেপে জীবনকে টেনে যেতে লাগলেন সামনের দিকে। ছোটবোনকে বিয়ে দিয়েছেন। নিজে বিয়ে করেছেন। সংসার হয়েছে। প্রযুক্তির কল্যাণে দুই বছর ধরে শ্রম কিছুটা কমেছে। প্যাডেলের রিকশা রেখে চড়েছেন অটোরিকশায়।

প্রতিবন্ধীদের জন্য সরকারের অনেক সুবিধার কথা শুনেছেন নুরুল্লাহ। পাননি কিছুই। একবার কেউ একজন বলেছিলেন, ঢাকা থেকে জামালপুরে যাওয়া-আসার ট্রেনের টিকিট অর্ধেক করে দিতে পারবেন। তার পরামর্শে বিভিন্ন ধরনের কাগজপত্র জোগাড় করে জামালপুরে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেছেন। মাসের পর মাস। কাজ হয়নি। সেই দুর্ভোগের কথা বললেন খেদ নিয়ে, ‘এর কাছে যাই ওই সমস্যা। ওর ওখানে যাই এই সমস্যা। পরে আমি বিরক্ত হয়ে বাদ দিছি।’

নুরুল্লাহর জীবনে এখন একটাই চাওয়া। মেয়েটার স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করা। কথা বলতে না পারলেও একা চলতে যেন পারে। সমাজের বিত্তবানদের কাছে তার নিবেদন। নিজের জন্য নয়। মেয়েটার প্রতি যদি কেউ সদয় হতো!

নুরুল্লাহর অতৃপ্ত চোখ স্বপ্ন দেখতে ভুলে যায়নি। কল্পনা করেন, তার মেয়েটা নিজের পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। আর কেউ না বুঝলেও তিনি বোঝেন, নিজের পায়ে চলতে না পারা কতটা কষ্টের। নিজের জীবন দিয়েই মেয়ের জীবনের কষ্ট বুঝতে পারেন অসহায় এই বাবা।  

 

আরও পড়ুন...