অভিভাবকহীন বুড়িগঙ্গা

আমাদের প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭ ১৪:২০

অভিভাবকহীন বুড়িগঙ্গা

কোনোভাবেই বুড়িগঙ্গাকে দূষণ ও দখলের কবল থেকে উদ্ধার করা যাচ্ছে না। নদীর তলদেশে জমে থাকা বিষাক্ত পলি এবং পানিতে ছড়ানো অ্যান্টিবায়োটিকের কারণে পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ এতটাই কমে গেছে যে, জলজ কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব আর খুঁজে পাওয়া যায় না।

এরই মধ্যে দূষণ ও দখলরোধ করে এ নদীতে প্রাণ সঞ্চারের লক্ষ্যে ‘বুড়িগঙ্গা পুনরুদ্ধার’ শীর্ষক বড় প্রকল্পের পুনর্বিন্যাস করেছে সরকার। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১১শ’ কোটি টাকারও বেশি। পরিকল্পনায় আছে, দখল ও দূষণমুক্ত করে হাতিরঝিলের মতো দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা তৈরি হবে বুড়িগঙ্গার দুপাশে। এর আগে স্বচ্ছ পানিপ্রবাহ বাড়ানোর জন্য বুড়িগঙ্গা খনন করে পুংলী, নতুন ধলেশ্বরী, তুরাগ ও যমুনা থেকে পানি আনার পরিকল্পনাও করা হয়েছিল। কিন্তু উল্লিখিত নদীগুলোতে চর পড়ে যাওয়ায় পানি আনার পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

মূলত বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও ঢাকা জেলা প্রশাসন যৌথভাবে সরকারের এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর আওতায় নদীর চারপাশের বর্জ্য অপসারণ ও দখল উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হলেও থেমে নেই দূষণপ্রক্রিয়া।

দীর্ঘকাল ধরে নানারকম পয়ঃবর্জ্য, গৃহস্থালি বর্জ্য, লঞ্চ-স্টিমার-জাহাজের বর্জ্যরে কারণেই দূষিত হচ্ছে নদীটি। বুড়িগঙ্গার দুই তীর এখনো ময়লা-আবর্জনার স্তূপে ভরে আছে। অভিযোগ উঠেছে, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও সংস্থার খামখেয়ালির কারণে শত উদ্যোগের পরও বুড়িগঙ্গা দূষণমুক্ত হচ্ছে না। অথচ সরকারের বিপুল অংকের টাকা খরচ হচ্ছে বুড়িগঙ্গায়।

জানা গেছে, বুড়িগঙ্গার দূষণরোধে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের যে উদ্যোগী ভূমিকা পালনের কথা ছিল তার কিন্তু কিছুই করা হয়নি। ফলে দিনে দিনে অবস্থার আরও অবনতি হচ্ছে। ক্রমাগত দখল আর দূষণে ধুঁকছে বুড়িগঙ্গা।

গবেষণায় মিলেছে, ৬২ রাসায়নিক বর্জ্যে বুড়িগঙ্গার পানি বিষাক্ত হয়ে আছে অনেক আগে থেকেই। এর ফলে বুড়িগঙ্গার চারপাশের বাতাসে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। নদীর তলদেশে প্রায় ৮ ফুট পুরো পলিথিনের স্তর জমেছে। শুধু তাই নয় এমোক্সাসিলিন, পেনিসিলিন, সিপ্রোফ্লোক্সাসিন আর অ্যাজিথ্রোমাইসিনের মতো উচ্চমাত্রার হাসপাতালের বর্জ্য মিশে বিষাক্ত হয়ে গেছে বুড়িগঙ্গার পানি। ফলে পানিতে অক্সিজেন অনেক কমে গেছে। নষ্ট হয়েছে পানির গুণাগুণ। পরিশোধন করেও এর থেকে পানীয় জল বের করা যাচ্ছে না। পানির রং বদলে তীব্র কালো হয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছর মার্চ-এপ্রিল নাগাদ এর অবস্থা আরও ভয়াবহ ছিল। এখন তৎপরতা চালানোর কারণে সামান্য পরিবর্তন ঘটেছে। তবে বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কোনো প্রতিষ্ঠান এককভাবে উদ্যোগ নিয়ে বুড়িগঙ্গা রক্ষা করতে পারবে না।

বুড়িগঙ্গার দূষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায়ী হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্প। সরকারের উদ্যোগের কারণে প্রায় অর্ধেক ট্যানারি কারখানা সাভারে স্থানান্তর হলেও এখনো ট্যানারি কারখানা থেকে বিপুল বর্জ্য নদীর পানিতে এসে মিশছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যতদিন ট্যানারি শিল্প এখান থেকে একেবারে না সরছে, ততদিন বুড়িগঙ্গা দূষণমুক্ত হবে না।

বুড়িগঙ্গা রক্ষায় বিআইডব্লিউটিএ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন যৌথ উদ্যোগে আদি বুড়িগঙ্গার উভয়পাশের গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে সম্প্রতি। কিন্তু একদিকে উচ্ছেদ ও অপরদিকে দখল দুই-ই চলছে। প্রভাবশালীরা সরকারের কোনো বিধিনিষেধের তোয়াক্কাই করছে না। অনেকেই বলছেন, দখলে ক্ষমতাসীন ও মন্ত্রণালয়ের কিছু কিছু কর্মকর্তার প্রশ্রয় আছে, তাই দখল বন্ধ হচ্ছে না। আর দূষণরোধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নজরদারির অভাব এখনো কাটেনি।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের শেষ ও চলতি বছরের প্রথম দিকেই বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ তীর থেকে প্রায় ১২৫টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে বিআইডব্লিউটিএ। কিন্তু এর কিছুদিন পরেই সেসব স্থান আবার দখল হয়ে যায়।

আদি বুড়িগঙ্গায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান কমডোর এম মোজাম্মেল হক বলেন, বিআইডব্লিউটিএ ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন যৌথভাবে নদীতীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে আসছে। এটি চলমান প্রক্রিয়া।

নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, উচ্ছেদ অভিযানের মধ্য দিয়ে বুড়িগঙ্গা রক্ষা সম্ভব নয়। কারণ সরকারি কিছু কাজ আছে- এটির একটি অংশ মাত্র। বুড়িগঙ্গা রক্ষা করতে সরকার ১৫শ কোটি টাকার প্রকল্পের মাধ্যমে কাজ চলছে। এই প্রকল্প নৌবাহিনীকে দেওয়া হয়েছে। সরকার কাগজপত্র সম্পূর্ণ করে পরিকল্পনা নেয় কিন্তু বাস্তবে কাজটি কতটুকু বাস্তবায়ন হয় তা দেখার বিষয়। তিনি বলেন, সরকার এ কাজটি ভালোভাবেই করবে। নদীপাড়ের কিছু লোক আছে যাদের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে সরকারের ঊধ্বর্তন কর্মকর্তারা দখলের সুযোগ করে দেন।

বুড়িগঙ্গা রক্ষায় কোনো সমন্বয় নেই জানিয়ে সিরাজুল ইসলাম বলেন, এ নদীরক্ষায় এককভাবে কারও দায়িত্ব নেই। নদীর পানি দেখে একজন, পাড় দেখে আরেকজন আবার নদীর ব্যবসা দেখে অন্যজন। এজন্য নদীরক্ষায় যে পরিকল্পনা বা কাজগুলো হয় তার সুফল আসে না।

তিনি বলেন, সরকার নদী কমিশন গঠন করেছে। কিন্তু নদী কমিশনকে ক্ষমতা দেয়নি। নদী কমিশন সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে কাগজ নিয়ে যাবে। সে প্রতিষ্ঠানগুলো নদী কমিশনের কাজ করবে কি করবে না তা নিয়েও শঙ্কা রয়ে গেছে।

নদীরক্ষায় রাজনৈতিক সমস্যা রয়েছে এমন কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন বলেন, রাজনৈতিক নেতারা যদি সঠিক নীতিমালা তৈরি না করেন তাহলে এ সমস্যার সমাধান হবে না। যত কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হোক- তা ঠিকই খরচ হয়ে যাবে। কিন্তু কাজ আশানুরূপ হবে না।

এ বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকার চাইলেই বুড়িগঙ্গা দূষণমুক্ত করতে পারে না। এ জন্য সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে। তবেই বুড়িগঙ্গাকে দূষণমুক্ত করা সম্ভব। 

 

আরও পড়ুন...