বাজেটে আয়কর নিয়ে এফবিসিসিআইর সুপারিশ

আমাদের প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ২১ এপ্রিল ২০১৮ ২০:৪৬

বাজেটে আয়কর নিয়ে এফবিসিসিআইর সুপারিশ

আসন্ন ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে ব্যবসায়ীদের বৃহত্তম সংগঠন এফবিসিসিআই আয়কর সংক্রান্ত বেশ কিছু নীতিগত সুপারিশ করেছে।

সংগঠনটির দাবি, এসব সুপারিশ বাজটে অন্তর্ভুক্ত করা হলে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি হবে, একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে।

সম্প্রতি এফবিসিসিআইর একটি প্রতিনিধি দল অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে দেখা করে তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো থেকে পাওয়া বিভিন্ন সুপারিশ সম্বলিত একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তুলে দেয়।

এফবিসিসিআইর সুপারিশে বলা হয়েছে, করদাতাগণের সামর্থ্য অনুযায়ী কর ও সারচার্জ আরোপনের লক্ষ্যে ব্যক্তিগত আয়করের করমুক্ত সীমা, কর ও সারচার্জের হারসমূহ পুনঃনির্ধারণ করা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত করভার কমালে সম্পদ ও মূলধন পাচারের প্রবণতা হ্রাস পাবে এবং সঠিক আয় প্রদর্শনে উৎসাহিত হবে, যা দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অধিক রাজস্ব আহরণে সহায়ক হবে। করদাতাদের করের বোঝা না বাড়িয়ে নতুন করদাতা শনাক্তকরণের কার্যক্রম গ্রহণসহ করের আওতা বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

এতে বলা হয়েছে, অর্থনীতিতে অধিকতর কর্মসংস্থান ও মূল্য সংযোজন করার লক্ষ্যে স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগকে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে উৎসাহিত ও প্রবাহিত করার জন্য প্রতিবেশী/নিকট প্রতিবেশী দেশসমূহের করপোরেট আয়কর হারের সমপর্যায়ে নির্ধারণ ও করপোরেট হার হ্রাসকরণ। হোল্ডিং এবং সাব-সিডিয়ারি কোম্পানির ক্ষেত্রে অর্জিত লভ্যাংশের ওপর দ্বৈতকর প্রত্যাহার তথা অর্জিত লভ্যাংশের ওপর বার বার  ট্যাক্স কর্তন করার বিধান রহিতকরণ করতে হবে।

উৎসে কর কর্তনের হার বাস্ততার নিরিখে পর্যালোচনা ও হ্রাসকরণ। বিশেষত আমদানির ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহার এবং একই খাতে মূল্য ভিত্তির ভিত্তিতে একাধিক কর কর্তনের হারের পরিবর্তে একক কর কর্তনের হার প্রবর্তন করা উচিত।

এফবিসিসিআই মনে করে, আয়কর কর্মকর্তা কর্তৃক কাল্পনিকভাবে জিপি নির্ধারণ না করে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্টের আওতায় এফআরসি স্বীকৃত চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট কর্তৃক নিরীক্ষিত হিসাব অনুযায়ী বিক্রয়, জিপি ও অন্যান্য খরচ গ্রহণ করার বিষয়টি কর আইনে অন্তর্ভুক্তিকরণ, দণ্ডসুদ আরোপের বিধানসমূহ পর্যালোচনা এবং করদাতাগণকে হয়রানিমুক্ত কর প্রদানে উৎসাহিত করা।

করদাতাগণের হয়রানি লাঘবের লক্ষ্যে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেওয়া আয়কর রেয়াত ও অব্যাহতিসমূহ আয়কর আইনে সন্নিবেশ করা উচিত।

আয়কর অধ্যাদেশের ১২০ ধারায় নতুনভাবে কর পুনঃনির্ধারণ করায় একদিকে করদাতাগণ একই কর বৎসরের জন্য একাধিক বার হয়রানির ও জুলুমের শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে একই কর বৎসরের জন্য একাধিক আপিল মামলা উৎপত্তি হচ্ছে। যেহেতু আয়কর নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় করদাতাদের হস্তক্ষেপ নেই তাই ওই প্রক্রিয়ায় ত্রুটির অজুহাতে করদাতাদের হয়রানি বন্ধ করার লক্ষ্যে নিবর্তনমূলক (আয়কর অধ্যাদেশের) ১২০ ধারা বিলোপ করতে হবে।

দ্রুত এবং দক্ষ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে নিরপেক্ষ  আপিল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। যেহেতু কর কমিশনারগণ কর নির্ধারণীর আদেশ অনুমোদন করেন এবং কর কমিশনার আপিলের সিদ্ধান্তের পরবর্তী ধাপ কর আপিলাত ট্রাইব্যুনাল, সেহেতু কর আপিলাত ট্রাইব্যুনালের সদস্যগণ কমিশনার পদমর্যাদার না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। নতুন আইনে এ বিষয়ে বিধান থাকা প্রয়োজন। এছাড়াও ট্রাইব্যুনালে কর্মরত/চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য বা কর কমিশনারদের নিয়োগ না দিয়ে এর পরিবর্তে ওই পদে অবসরপ্রাপ্ত আয়কর কর্মকর্তা বা বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ কর/হিসাব পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্তি করার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। উচ্চ আদালতে আপিল দায়েরের আগে বিরোধীয় করের ২৫ শতাংশ পরিশোধের আইনের বাধ্যবাধকতা বিলোপ করা উচিত। কর আপিলাত  ট্রাইব্যুনালকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনা সমীচীন হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিরোধ নিষ্পত্তিতে এডিআর কার্যক্রমকে অধিকতর আকর্ষণকরণ। বিভাগীয় প্রতিনিধিদের দায়বদ্ধতা ও বিরোধ নিষ্পন্নে সহযোগিতা নিশ্চিতকরণ ও সহায়তাকারীর ভূমিকা আরও জোরদারকরণের লক্ষ্যে এতদসম্পর্কীয় আইন ও বিধিমালাসমূহ পর্যালোচনা করে সংশোধন করতে হবে। উচ্চ আদালতে বিচারাধীন মামলাসমূহ এডিআর কার্যক্রমে আনয়নের লক্ষ্যে করদাতাদের উদ্বুদ্ধকরণ এবং কর আইনজীবীসহ বিভিন্ন কর-সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের উদ্বুদ্ধকরণের কার্যক্রম গ্রহণসহ এডিআর অফিসের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকরণ। যদি করদাতারা তাদের দাখিলকৃত মামলাসমূহ বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিতে সুরাহা করতে চান তবে আয়কর বিভাগ কর্তৃক দাখিলকৃত একই কর বৎসরের আপিল মামলাসমূহ ও যুগোপৎ শুনানির মাধ্যমে এডিআরে নিষ্পন্নের আইনগত বিধান সংযোজন করতে হবে।

এছাড়াও এফবিসিসিআইর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মূলধন পাচার প্রতিরোধের জন্য, কর্মসংস্থান সৃষ্টির ও ভবিষ্যৎ রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে শিল্প ও গৃহনির্মাণ খাতে বিনিয়োগ প্রবাহিত করার লক্ষ্যে কর রেয়াত দেওয়া যেতে পারে।

পশ্চাৎপদ এলাকা ও অগ্রাধিকারমূলক খাতসমূহে বিশেষ করে বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট, পরিবেশ রক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক দায়বদ্ধতামূলক কার্যক্রম, কৃষি ও গ্রামীণ শিল্প প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র পোল্ট্রি, হ্যাচারি, দুগ্ধশিল্প ইত্যাদি রেয়াতি কর ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা এবং এসএমই খাতকে প্রণোদনা ও বিকাশের লক্ষ্যে হ্রাসকৃত হারে কর আরোপ করা, বাংলায় সহজবোধ্য নতুন কর আইন প্রণয়ন এবং এফবিসিসিআইসহ অন্যান্য অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে তা  চূড়ান্ত করতে হবে।

সর্বোপরি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আয়কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ২০১৭-১৮ সালের লক্ষ্যমাত্রার ওপর ১৫ শতাংশে (মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির হারের যোগফলে)  সীমিত রাখার সুপারিশ করেছে এফবিসিসিআই।

 

আরও পড়ুন...