কোটা আন্দোলনে অংশ নেয়া কলেজছাত্রীর ওপর ‘যৌন নিপীড়ন’

আমাদের প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ০৫ জুলাই ২০১৮ ২২:৩৯

কোটা আন্দোলনে অংশ নেয়া কলেজছাত্রীর ওপর ‘যৌন নিপীড়ন’

কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে কোটা সংস্কারের আন্দোলনকারীদের কর্মসূচিতে গিয়ে হামলাকারীদের হাতে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন মরিয়ম মান্নান নামে এক কলেজছাত্রী। মরিয়ম দাবি করেছেন, তাকে সেদিন অটোরিকশায় তুলে শাহবাগ থানায় নেওয়া পর্যন্ত যৌন নিপীড়ন চালানো হয়েছিল।

তার অভিযোগ, পুলিশ গত ২ জুলাই রাতভর শাহবাগ থানায় আটকে রেখে ভয়ভীতি দেখায়।

সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, “এসে দেখি কিছু লোক ফারুক ভাইকে প্রচুর মারতেছে। তখন এ দৃশ্য দেখে আমি ফারুক ভাইকে বাঁচাতে এগিয়ে যাই। আমি ফারুক ভাইকে একটি রিকশায় তুলতে চাইলে ওই ছেলেরা ফারুক ভাইকে মেরে একটি মোটর সাইকেলে করে তুলে নিয়ে যায়।”

তিনি বলেন, “সিএনজির প্রত্যেকটা মুহূর্ত ছিল আমার কাছে জাহান্নাম। আমার সাথে যেটা হয়েছে, তা আপনাদের সামনে বলতে আমার খুব খারাপ লাগছে।”

কারা ধরে নিয়েছিল- সাংবাদিকরা জানতে চাইলে মরিয়ম বলেন, তাদের তিনি চেনেন না। তবে ফারুককে যারা মারধর করেছিলেন, তারাই তাকে থানায় নিয়ে যান।

থানায় অবস্থানের বিষয়ে মরিয়ম বলেন, “আমি ভাবছি, হয়ত থানায় গেলে আমি সেইফ থাকব। কিন্তু না, থানা ছিল আমার জন্য সেকেন্ড জাহান্নাম।”

থানায় পুলিশ তাকে জোর করে মাদকসেবী প্রমাণের চেষ্টা চালিয়েছিল বলে অভিযোগ এই ছাত্রীর। তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

মরিয়ম বলেন, “আমি যখন বারবার কান্না করে বলতেছি, আমার বাসায় একটা ফোন দিতে দেন, আমি বাসায় যাব। দিচ্ছে না, বলে কী- ‘নেতা হবা? নেতা হতে হলে জেল খাটতে হয়’।

“তারা আমাকে স্বীকার করাচ্ছে, কেন্দ্রীয় কমিটির (পরিষদ) অনেক গোপন খবর আমি জানি। তাদেরকে তা দিতে হবে।”

রাতভর রাখার পর ২ জুলাই দুপুরে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানান মরিয়ম। তিনি বলেন, এজন্য তার ভগ্নিপতি এক পুলিশ কর্মকর্তাকেও ফোন দিতে হয়েছিল।

কলেজছাত্রী মরিয়ম মান্নানের অভিযোগ, তাকে থানায়ও নিগ্রহের শিকার হতে হয়েছিল কলেজছাত্রী মরিয়ম মান্নানের অভিযোগ, তাকে থানায়ও নিগ্রহের শিকার হতে হয়েছিল।

মরিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান বৃহস্পতিবার বিকালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এই কলেজছাত্রীকে থানায় কোনো ধরনের নির্যাতন কিংবা ভয়-ভীতি দেখানো হয়নি। তার অভিযোগ ভিত্তিহীন।

থানায় আটকে রাখার বিষয়ে ওসি বলেন, “আমরা তার পরিবারের জন্য জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তার স্বামী আসার পর তার কাছে তাকে হস্তান্তর করা হয়।”

মরিয়মকে কেন-কীভাবে হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল- জানতে চাইলে ওসি তাৎক্ষণিকভাবে এর উত্তর দিতে পারেননি। তিনি বলেন, বিষয়টি জেনে তাকে বলতে হবে।

মরিয়ম কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে এতদিন সক্রিয় থাকা শিক্ষার্থীদের এখন সক্রিয় না দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

“আমি সবার সামনে যেমন এসেছিলাম, আজকে আমি তেমন সবার সামনে চলে যাব। কেন চলে যাব জানেন? ওই ৩০ লাখ ছেলে-মেয়ে এখানে নাই। আমি যখন লাঞ্ছিত হইছি, তখন আমার পাশে কেউ ছিল না। আমার সেই ভাইয়েরা কই, যাদের জন্য আমি আসলাম? যারা বলেছিল পাশে দাঁড়াবে, সেই একটা ভাইকেও তো আমি দেখি না।”

“আমি শিবির না, আমি জামায়াত না… আমার ক্ষোভ ওই ৩০ লাখ ছেলে-মেয়ের প্রতি, যাদের জন্য আমি আসছিলাম। আমি তাদের জন্যই এখন চলে যাব। কোটার সাথে এই মুহূর্ত থেকে আমার কোনো সম্পর্ক নাই। এখন বাসায় চলে যাব।”

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’ গত ২ জুলাই শহীদ মিনারে কর্মসূচি পালনে গিয়ে ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মীর হামলার শিকার হয়।

সেদিন পরিষদের ওই কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছিলেন ঢাকার একটি বেসরকারি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী মরিয়ম। সেদিন মারধরের হাত থেকে পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক ফারুক হাসানকে রক্ষায় এগিয়ে যেতে দেখা গিয়েছিল তাকে। ওই দিন ফারুককে ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মী মোটর সাইকেলে তুলে শাহবাগ থানায় নিয়ে গিয়েছিল। পরে তাকে গত ৮ এপ্রিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচর্যের বাড়িতে হামলার মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।

মরিয়ম অভিযোগ করেছেন, সেদিন ফারুককে নেওয়ার পর তাকেও একটি সিএনজি অটোরিকশায় তুলে শাহবাগ থানায় নেওয়া হয়েছিল।

আন্দোলনকারীদের উপর দফায় দফায় হামলার প্রতিবাদ এবং ক্যাম্পাসে নিরাপত্তার দাবিতে বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রী হলের শিক্ষার্থীরা মিছিল বের করে।

ওই মিছিল শেষে রোকেয়া হলের সামনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন মরিয়ম। তার সঙ্গে ছিলেন কোটা সংস্কারের আন্দোলনে সক্রিয় ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী আফসানা সাফা এবং উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী শেখ মৌসুমী আহমেদ। তারা অভিযোগ করেন, এখানে আসার আগে তারা গ্রন্থাগারের সামনে বিক্ষোভের সময় ছাত্রলীগ নেতারা তাদের কটূক্তি ও হয়রানির চেষ্টা করে।

ফারুককে মারধরের সময় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের সক্রিয় দেখা গিয়েছিল। তাকে মোটর সাইকেলে করে শাহবাগ থানায় নিয়ে যাওয়ার কথা এর আগে স্বীকার করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আল-আমিন রহমান।

মরিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের বিদায়ী কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক সাইফ উদ্দিন বাবু তা ‘মিথ্যাচার’ বলে উড়িয়ে দেন।

 

আরও পড়ুন...