আকাশে-বাতাসে রোহিঙ্গা নারী-শিশুর কান্নার রোল

| প্রকাশিত: ০৬ অক্টোবর ২০১৭ ১৮:৪২

আকাশে-বাতাসে রোহিঙ্গা নারী-শিশুর কান্নার রোল

মুখ পর্দায় ঢাকা। টেলিভিশনে মিয়ানমারের সেনাদের নির্যাতনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন এক নারী। তার ভাষ্য, ‘সেনারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছিল। যাকে সামনে পাচ্ছে, তাকেই গুলি করে হত্যা করছে কিংবা গলায় ছুরি বসিয়ে জবাই করছে। এমন খবর পেয়ে আমরা সবাই ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে শুরু করি। গ্রামের সবাই মিলে জঙ্গলের পাশে একটা নির্জন বাড়িতে আশ্রয় নেই। জনা দশেক নারী ছিল আমার সঙ্গে। এদের মধ্যে ৬ জন বের হয়ে যান। আমরা ৪ জন ছিলাম। হঠাৎ ১০ সেনাসদস্য এবং ১২ থেকে ১৫ জন স্থানীয় লোক বাড়ি ঘিরে ফেলে। কয়েকজন সেনাসদস্য আমার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। এ নির্যাতনের পাশাপাশি চলতে থাকে লাথি, কিল, ঘুষি।’

মিয়ানমারের রাখাইনের মংডুতে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন এই নারী। ঘটনাটি ঈদের কয়েক দিন আগের। এই নারী এখন কক্সবাজারের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে আছেন। আশ্রয়কেন্দ্রে স্বামীর সঙ্গে থাকছেন তিনি। সঙ্গে আছে তার চার সন্তান। না খেয়ে, অর্ধপেট খেয়ে শিশুদের নিয়ে দীর্ঘপথ হেঁটে বাংলাদেশে প্রবেশ করায় তারা কঙ্কালসার হয়ে গেছেন। এদের অনেকে দুই সপ্তাহে প্রায় ৫০ মাইল পর্যন্ত পথ হেঁটে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন।

তারা প্রায় সবাই দুই সপ্তাহ ধরে পাহাড়ে লুকিয়ে ছিলেন মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও রাখাইন সন্ত্রাসীদের ভয়ে। তারা হাতের কাছে যা ছিল তা নিয়ে বের হয়ে আসায় সঙ্গে তেমন কিছুই আনতে পারেননি, খাবার তো নয়ই। অনেকেই কিছু চাল ও শুকনো খাবার আনতে পেরেছিলেন। এগুলো দুই-তিন দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। এরপর গাছের নরম মূল, শেকড়, চিবানো যায় এমন নরম পাতা খেয়ে দিন কাটিয়েছেন। ফলে পুষ্টির ঘাটতি দেখা দেয় শিশু ও নারীদের মধ্যে বেশি।

বুচিডংয়ের গ্রামের মোর্শেদা (২২) ছোট তিনটি শিশুসন্তান নিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন বাংলাদেশে। তার স্বামী নুর আলমসহ ১০ জনকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী (তাদের ভাষায় মিলেটারি) ব্রাশফায়ারে হত্যা করে। এটা দেখে হামিদা আর দেরি না করে শিশুদের নিয়ে বের হয়ে পড়েন। একই সঙ্গে মোর্শেদার বোনের স্বামীকে পুড়িয়ে হত্যা করে সেনাসদস্যরা। এত দিন না খেয়ে থাকায় মোর্শেদা নিজে যেমন শুকিয়ে গেছেন তেমনি তার শিশুসন্তানরা কঙ্কালসার হয়ে গেছে। মোর্শেদা এত শুকিয়ে গেছেন যে, তিনি কথাই বলতে পারছিলেন না।

নিজের চেয়ে একটু কম বয়সের স্বামী যুবায়েরকে নিয়ে ইয়াসমিন তার শিশুসন্তানদের নিয়ে চলে এসেছেন বাংলাদেশে। বুচিডংয়ে মাছ ধরে দিন নির্বাহ করেন যুবায়ের। ইয়াসমিনের বুচিডং থেকে বের হওয়ার দুই দিন পর জঙ্গলে তার একটি সন্তানের জন্ম হয়। মিয়ানমারেই যক্ষ্মায় আক্রান্ত ইয়াসমিন জোরে কথা বলতে পারছিলেন না। তার স্বামী যুবায়ের শরীরের চেয়ে বড় সাইজের একটি গেঞ্জি গায়ে দেওয়ায় তার বুকের হাড়গুলো দেখা যাচ্ছিল। হাতগুলো দেখলে মনে হয় মিয়ানমারে প্রচ- পরিশ্রমের কাজ করতেন।

ইয়াসমিন ক্ষীণস্বরে জানান, তারা একটি নির্জন দ্বীপে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিন সপ্তাহ আগে। প্রায় না খেয়েই কেটেছে দিনগুলো। অনেক কষ্ট করে বাংলাদেশে আসার পরও তেমন খাবার পাননি। তারপরও তাদের ভালো লাগছে। কারণ এখানে পেছনে তাড়া করার কেউ নেই, নেই গুলি খেয়ে মরার ভয়। তারা যেখানে ছিলেন সেখানেই ফিরে যেতে চান। কারণ সেখানে তারা জন্মেছেন, বড় হয়েছেন।

প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা শিশু-নারী-পুরুষ সবাই অপুষ্টিতে ভুগছেন। তবে এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হবে গর্ভবতী নারীদের কথা। নিশ্চিতভাবেই তারা গর্ভকালীন সময়ের সুষম খাদ্য, বিশ্রাম পাচ্ছেন না; যেগুলো একজন গর্ভবতী নারীর জন্য অত্যাবশ্যক।
নিজ দেশে তারা ‘অবহেলিত’ ছিলেন। স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা তাদের জন্য তেমন ছিল না। বর্তমানে বাংলাদেশে ১৬ হাজার গর্ভবতী নারীর প্রসব কোথায় হবে, তাদের জটিলতাগুলো কী করে সমাধান করা হবে, সেসব বিষয়েও ভাবতে হচ্ছে। কারণ প্রতিদিনই রোহিঙ্গা নারীদের কেউ না কেউ সন্তান প্রসব করছেন। এদিকে গর্ভবতী মায়েরা অপুষ্টিতে থাকলে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরও সন্তানদের সেই অপুষ্টির রেশ বহন করতে হবে। নারীরা অপুষ্টিতে ভুগছেন এবং এর প্রভাব তাদের সন্তানের ওপর পড়বে। একজন গর্ভবতী নারী পুষ্টিহীনতায় ভুগলে তার গর্ভের সন্তান পর্যাপ্ত খাবার পায় না। ফলে গর্ভাবস্থায় সন্তানটির যেভাবে বেড়ে ওঠার কথা, সেটি হয় না। অন্যদিকে গর্ভবতী নারী পুষ্টিহীনতায় ভুগলে ‘প্রি মেচিউর লেবার’ বা অকাল প্রসবের আশঙ্কা থাকে। এতে করে বাচ্চাটি সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় জন্ম না-ও নিতে পারে।

গণমাধ্যম মারফত জানতে পারা যায়, ৭ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যমজ দুই শিশুসহ ১৭টি সন্তান প্রসব করেছেন তারা। কেউ রাস্তায় আবার কেউ বারান্দায় সন্তান প্রসব করেছেন। যেসব ঝুপড়ি ও বারান্দায় সন্তান প্রসব হয়েছে সেসব স্থানে লাল ও হলুদ পতাকা টাঙানো হয়েছে। রোহিঙ্গা মহিলারা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করেন না বললেই চলে। প্রতিটি পরিবারে ৪-৫ জন করে শিশু রয়েছে। কারও কারও ১০-১২ জন সন্তানও আছে। এ পর্যন্ত দুই শতাধিক নারী সন্তান প্রসব করেছেন। এখনো সন্তানসম্ভবা শত শত নারী রয়েছেন। এসব নারী চরম স্বাস্থ্যহীনতায় ভুগছেন, রয়েছেন ঝুঁকিতে।

অপুষ্টির শিকার নারীদের প্রসবকালীন অল্প রক্তক্ষরণেই বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এমনকি তা প্রাণঘাতীও হতে পারে। তাই গর্ভবতী যেকোনো নারীর পুষ্টির দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। যেকোনো গর্ভবতী নারীর সুষম খাবার দরকার; সকালে দুই ঘণ্টা, বিকালে দুই ঘণ্টা ও রাতে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিশ্রামের দরকার। কিন্তু এই রোহিঙ্গা নারীরা ৮ থেকে ১০ দিন পায়ে হেঁটে, নদী পার হয়ে বাংলাদেশে এসেছেন। এই সময়ে তাদের না খেয়ে থাকতে হয়েছে। এর প্রভাব তাদের অনাগত সন্তানদের উপরও পড়বে।

মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে শরণার্থী শিবিরে আসা নারীদের মধ্যে প্রায় ১ হাজার নারী অভিযোগ করেছেন তারা সে দেশে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সে অনুযায়ী প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী যৌন নির্যাতনের শিকার। নারীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা চালানোর বিষয়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর দীর্ঘ ও বিকৃত ইতিহাস রয়েছে। রাখাইনে রোহিঙ্গা নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর চালানো লোমহর্ষক হামলা বর্বরতার নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছে। অনেক রোহিঙ্গা নারী জানান, বার্মার সেনাবাহিনীর হামলার সময় যারা পালিয়ে গিয়েছিলেন তারা প্রাণে বেঁচে গেছেন। আর যারা পালাতে পারেননি তারা ‘জুলুমের’ (ধর্ষণ) শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে কেউ নিহত হয়েছেন, কেউ ধর্ষণের যন্ত্রণা নিয়ে প্রাণে বেঁচে আছেন। অনেকে ইতিমধ্যে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী জানান তার বীভৎস নির্যাতনের কথা। বলেন, ‘জুলুমের’ পর আমরা সীমাহীন কষ্ট সহ্য করে বাংলাদেশে এসেছি। এখানে এসে আমার মতো অনেক নারীই চিকিৎসা নিতে চেয়েছেন। কিন্তু চিকিৎসা পাচ্ছি না। আমি নির্যাতনের পরেও প্রাণে বেঁচে গেছি। কিন্তু অনেক মেয়ে আছে যাদের ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

পালিয়ে আসা শরণার্থী রোহিঙ্গা নারীদের একটা বড় অংশ বর্মী সেনাবাহিনীর হাতে যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। অনেকে যৌন নির্যাতনের পর হত্যার শিকার হয়েছেন বলে পালিয়ে আসা পরিবারগুলো বলছে। বাংলাদেশের ভূখ-ে এসে এসব নারী লোকলজ্জার ভয়ে চিকিৎসা সেবা নিতে পারছেন না।

জোহরা শিউলী: লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী

আরও পড়ুন...