উৎপল তোমার অপেক্ষায়

অনলাইন ডেস্ক | প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর ২০১৭ ২২:৪৯

উৎপল তোমার অপেক্ষায়

নিখোঁজ সাংবাদিক উৎপল দাসকে নিয়ে লিখব তা কল্পনাও করিনি! এটা তো ইতিবাচক বিষয় নয়? আমি চেয়েছিলাম ওর সুকুমার বৃত্তির সাফল্য নিয়ে অক্ষর সাজাব। উচ্ছল ধীমান এবং প্রাণচঞ্চল উৎপল কোথায় আছে আমরা জানি না! পরিবারের উদ্ধৃতি দিয়ে সংবাদ মাধ্যমে যা খবর এসেছে তাতে আশাহত হইনি আমরা। তবে ওর সন্ধান না পাওয়া অবধি পরিবারের সদস্যের মতো বিষয়টি আমাদের কাছেও অবশ্যি উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার! আজ ২০ দিন হয়ে গেল কিন্তু নিখোঁজ সাংবাদিক উৎপল দাসের খবর নেই! অথচ নীরব প্রশাসনের কত বিভাগ ও সংস্থা।

উৎপল নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে মা খাওয়া-দাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন। বিছানায় শয্যাশায়ী মা-পুত্রের জন্য প্রলাপ বকছেন। উৎপলের খোঁজে বাবা, বড় দু’বোন এবং বড় ভাই নরসিংদীর রায়পুরা থেকে ঢাকায় ছুটে এসেছেন ২৬ অক্টোবর। ক্র্যাব অফিসে সংবাদ সম্মেলনে কথাই বলতে পারছিলেন না উৎপলের নিকট স্বজনরা। বড় বোন বিনীতা দাস ভাইয়ের জন্য কেবলই মূর্ছা যাচ্ছিলেন। বড় ভাই পলাশ দাস বাকরুদ্ধ! হাতের তালুতে শুধু চোখ, নাক, মুখ মুছছিলেন। দ্বিতীয় বড় বোন প্রাইমারি শিক্ষিকা ববিতা দাস। তিনি ১০ অক্টোবরের আগে উৎপলের ফোনালাপের কথাগুলো বলছিলেন উপস্থিত সাংবাদিকদের। কান্নাজড়ানো কণ্ঠ তার আড়ষ্ট হয়ে আসছিল। বললেন আমরা সাধারণ পরিবারের মানুষ। আমাদের কেউ নেই শুধু আপনারা ছাড়া! আপনারা আমার ভাইকে এনে দিন। না হলে আমাদের মা বাঁচবেন না।

শিক্ষক পিতা চিত্তরঞ্জন দাস সংবাদ সম্মেলনে বললেন, ‘সারাজীবন প্রাথমিক শিক্ষায় নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছি। ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করেছি। অন্যায় করিনি আমরা। ছোট সন্তান উৎপল কারো ক্ষতি করেছে আমার তো মনে হয় না! ওর শত্রু আছে আমি বিশ্বাস করি না। আমরা কিছুই চাই না শুধু উৎপলকে ছাড়া। উৎপল উদ্ধারের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’ ২০০৭ সালের মার্চের এক সকাল। মহানগরীর ফকিরেরপুল। পাক্ষিক অর্থকাগজ পত্রিকার সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ে প্রথম কথা চটপটে ও সপ্রতিভ উৎপলের সঙ্গে।

শিক্ষানবিস হিসেবে যোগ দিল সেদিনই পাক্ষিক অর্থকাগজে। তখনও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কথা হলো ক্লাস শেষ করে বিকেলে আসবে অফিসে। ছুটির ফাঁকে ফাঁকে কাজগুলো করবে। মনে পড়ে অর্থকাগজে ওর প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট ছিল সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদন ভিক্ষুকের আয়-রোজগার। হাতে-কলমে পরিসংখ্যান ও উপাত্ত সংগ্রহ এবং প্রতিবেদনে এর পরিমিত ব্যবহারের কৌশল ওকে শেখানোর চেষ্টা করেছি। ওকে নিয়ে আমি ব্যাংক, বীমা এবং ব্যবসায়ী মহলে গিয়েছি। পরিচয় করিয়ে দিয়েছি। প্রায় দু’ মাস ওর আগ্রহ লক্ষ্য করলাম। একদিন সকালে উৎপলের বাবা এবং বোন ববিতা আমাদের অফিসে এসে হাজির। আমার পরিবারের জন্য গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছেন ৫ কেজি গাভীর দুধ এবং ক্ষীরের সন্দেশ! কিন্তু উৎপল নেই! ছেলে মাসখানেক বাড়িতে যায় না। বেশ কিছুদিন ধরে ঢাকায় ওর টিউশনির বাসায় নাকি উৎপল অনুপস্থিত। দুপুরে আমরা ৩ জন আহার সারলাম।

ববিতা বললেন, ‘স্যার আমরা সবাই আশ্বস্ত হয়েছি ছোট ভাই উৎপল ঢাকায় আপনার মতো একজন ভালো অভিভাবক পেয়েছে। উৎপলের বাবা বললেন, ‘বাবু, আমার ছোট ছেলেটা বেশ চঞ্চল ওকে একটু বুঝিয়ে শুনিয়ে রাখবেন।’

উৎপলের বাবাকে কাকা বলে সম্বোধন করে বললাম, আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। কিছুদিন অর্থকাগজে অনুপস্থিত উৎপল! খবর নিলাম। ও ক্লাসও করে না। প্রায় রাতেই মেসে ফেরে না। খণ্ডকালীন সাংবাদিকতার কাজেও অনিয়মিত সে! দু’বছর সাত মাস অনিয়মিতভাবেই অর্থকাগজে কাজ করে উৎপল। দীর্ঘ ৩৩ দিন উৎপল দাস অফিসে অনুপস্থিত! পরে সহকর্মী অহিদুজ্জামান মিঞা জানালেন, উৎপল দাস দৈনিক জনতা পত্রিকায় যোগ দিয়েছেন। আমি খুশি হয়েছিলাম এই ভেবে যে, পাক্ষিক থেকে দৈনিকে কাজের সুযোগ পেয়েছে ও! তাও আবার অর্থনৈতিক বিটে। এখানেও বেশিদিন থাকল না সে। বহুদিন পর প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে উৎপলের সঙ্গে দেখা! পা ছুঁয়ে প্রণাম করে বলল, আমি দৈনিক যায়যায়দিন-এ স্যার! ওর সঙ্গে দেখা হওয়ার প্রায় ২ মাস পর তেজগাঁও লাভ লেনে যায়যায়দিন পত্রিকা অফিসে গিয়ে অরুণ দে দাদার কাছে শুনি উৎপল দাস এখন এখানে কাজ করেন না।

উৎপল দাসকে ঘিরে অনেক ঘটনা! আমার পরিবারের কার্যক্রমেও ওকে সম্পৃক্ত করেছি।

২০১২ সালের ঠিক এমন সময় এক সন্ধ্যায় সাংবাদিক উৎপল দাসকে কিছু সময়ের জন্য পেয়েছিলাম শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে। বলল ‘বোহেমিয়ান জীবনই উত্তম। একদিন দেখবেন নিরুদ্দেশ হয়ে যাব স্যার! কিছুদিন পর আবার ফিরে আসব পঙ্কিল এই জনাকীর্ণ লোকালয়ে!’ না পাওয়ার বেদনায় ভারাক্রান্ত বাবা ও ক্রন্দনরত মা বসে আছেন ছেলের জন্য।  অশ্রুজলে আকুল বড়দি ও ছোটদি। ফিরে এসো উৎপল! তোমার কথাই যেন সত্যি হয় উৎপল! কারণ তোমার জন্য অপেক্ষা করছে তোমার প্রিয় সেগুনবাগিচা ডিআরইউ, প্রেসক্লাব এবং শাহবাগ চত্বর। আমরা সবাই তোমার অপেক্ষায়!

লেখক:  প্রণব মজুমদার
সম্পাদক, পাক্ষিক অর্থকাগজ

আরও পড়ুন...