ঈদ কেনাকাটা ক্যাশের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে কার্ড

news-details
অর্থনীতি

আমাদের প্রতিবেদক

ঈদ এলেই বাড়ে কেনাকাটা। এ সময় লেনদেন বৃদ্ধি পায় কয়েক গুণ। আর এই উৎসবকে ঘিরে ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডে কেনাকাটায় অফারের প্রতিযোগিতা শুরু করেছে ব্যাংকগুলো। পাশাপাশি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ব্যাংকের লেনদেন-সেবা বা পেমেন্ট সার্ভিসগুলো দিয়েও কেনাকাটার ব্যবহার বাড়ছে। উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রায়  সব কার্ড ও মোবাইল পেমেন্ট সার্ভিসে কেনাকাটায় নানা রকম ছাড় ও টাকা ফেরতের (ক্যাশব্যাক) সুবিধা দেয়া হচ্ছে। 

কেনাকাটা, ইফতার, সেহেরি ও তারকা হোটেলে থাকার ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় পাচ্ছেন গ্রাহকরা। কার্ডের মাধ্যমে নির্দিষ্ট শোরুম থেকে কেনাকাটায় ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় পাচ্ছেন গ্রাহকেরা। পাশাপাশি মুঠোফোন বা মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বিকাশ, রকেট ও নগদ এর মাধ্যমে কেনাকাটাতেও মিলছে নানা ছাড়।

ফলে প্রায় ৪০ শতাংশ কেনাকাটা ডিজিটাল মাধ্যমে হচ্ছে বলে জানা গেছে। এতে করে কার্ডভিত্তিক লেনদেন বাড়ছে ও নগদ টাকার ব্যবহার কিছুটা কমে আসছে বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা। তারা জানান, উৎসবগুলো ব্যাংকের ব্যবসা বাড়ানোর একটি অন্যতম মাধ্যম। বরাবরই সব ধরনের কার্ডে ছাড়ের ব্যবস্থা রাখে ব্যাংক।

অন্যান্য সময়ের তুলনায় ৩০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত কার্ড ভিত্তিক লেনদেন বেড়ে যায় ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবে। ফলে এ বছরের ঈদকেন্দ্রিক ডিজিটাল কেনাকাটা বেশ জমে উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, কেনাকাটা বা লেনদেনে বাংলাদেশে নগদ অর্থের পরিবর্তে কার্ডের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদ বাজারে নগদ টাকা নিয়ে ঘোরাঘুরি করা ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে ব্যাংকের ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড থাকলে এ ঝুঁকি এড়ানো যায়। আর এখন প্রায় সকল দোকানেই কার্ডের মাধ্যমে কেনাকাটার বিল পরিশোধ করা যায়। 
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশের ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে ৩৯টি ব্যাংকে এ সেবা রয়েছে। বর্তমানে প্রতি মাসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। গত জুনে দেশে ক্রেডিট কার্ড ছিল ৯ লাখ ৩৬ হাজার ১৪৮টি। আগের বছরের জুনে এ সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ১ হাজার ৬২৪। অর্থাৎ এক বছরে ক্রেডিট কার্ড বেড়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫২৪টি। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই ঈদে যেসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যারা ছাড় ঘোষণা করেছে তাদের মধ্যে অন্যতম হলো, ব্র্যাক ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, সাউথ ইস্ট ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও লংকাবাংলা ফিন্যান্স। দেশে সাধারণত ভিসা, মাস্টারকার্ড ও আমেরিকান এক্সপ্রেস (এ্যামেক্স) ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড দেয় ব্যাংকগুলো। 

ব্র্যাক ব্যাংক তাদের সব কার্ডধারীর জন্য ৬৩টি ফ্যাশন হাউসের সব ধরনের কাপড়ের ওপর ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়, ৩২টি রেস্টুরেন্টে খাবারের ওপর ২০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে। 

পূবালী ব্যাংকের কার্ডধারীরা ২২ শতাংশ ছাড় পাচ্ছেন আহং, স্টাইলসেল, জারা, নাগরদোলা, লিলাবালি, সেলাই ঘর, ও নকশীতে। 
অনলাইন দোকানগুলোতে অ্যামেক্স কার্ডধারীরা ১০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় পাচ্ছেন। এ ছাড়া অ্যামেক্স গ্রাহকরা ঢাকার শীর্ষস্থানীয় ১৬টি রেস্টুরেন্টে একটি কিনলে একটি ফ্রি সুযোগ পাচ্ছেন। 
লাইফস্টাইল, জুয়েলারি, ডাইনিং বা সাজগোজে বিশেষ ছাড়ের সুবিধা রেখেছে লংকাবাংলা ফিন্যান্স লিমিটেড। এ ছাড়া নির্দিষ্ট কয়েকটি রেস্টুরেন্টে একটি কিনলে একটি ফ্রি দিচ্ছে তারা। 
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে আড়ং ও অ্যাপেক্সে কেনাকাটায় মিলছে ৩০ শতাংশ ছাড়। ১২ শতাংশ ছাড় মিলছে আগোরা, মীনাবাজার ও স্বপ্নে কেনাকাটায়। 

ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) গ্রাহকেরা কার্ডে কেনাকাটায় আড়ং, অ্যাপেক্স, দেশি দশ, রিচম্যান, ইনফিনিটি, আগোরা ও ইউনিমার্টে পাচ্ছেন ১০ শতাংশ ক্যাশ ব্যাক সুবিধা। আরো কিছু ব্র্যান্ডে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত সুবিধা পাচ্ছেন ব্যাংকটির গ্রাহকেরা।
সাউথ ইস্ট ব্যাংক তাদের সব ক্রেডিট কার্ড হোল্ডারের জন্য ৩৪টি ফ্যাশন হাউসের সব ধরনের কাপড়ের ওপর ৩৪ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়, ১১টি রেস্টুরেন্টে সব খাবারের ওপর একটি কিনলে একটি ফ্রি পাওয়ার ব্যবস্থা রেখেছে। 

গ্রাহকদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে লাইফস্টাইল পণ্য ও খাবার দাবারে বিভিন্ন অফারের ব্যাবস্থা করেছে প্রাইম ব্যাংক। খাবার পণ্যে বাই ওয়ান গেট ওয়ানসহ ঈদের কেনাকাটায় ক্রেডিট কার্ডহোল্ডারদের জন্য থাকছে ১০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়। 

রামজান মাসজুড়ে ঈদের কেনাকাটায় ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের জন্য অফারের ব্যবস্থা করেছে ব্যাংক এশিয়া। দেশের বিভিন্ন শোরুমে ৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় পাবেন কার্ডহোল্ডাররা।

সিটি ব্যাংকের কার্ড বিভাগের প্রধান মো. মাসুদ জানান, গ্রাহকদের ঈদ আনন্দ বাড়িয়ে দিতে আমাদের এই উদ্যোগ। প্রতিবছরই আমরা প্রচুর সাড়া পাই। অন্যান্য সময়ের তুলনায় উৎসবকেন্দ্রিক ছাড়ের কারণে আমাদের কার্ডের লেনদেন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। আর উন্নত দেশগুলোতে বিভিন্ন উৎসবে কম দামে কেনাকাটা করা যায়। 
এদিকে বিভিন্ন দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোও এখন অনলাইনে পণ্য বিক্রি করছে। তাদের অনলাইনে পোশাক বিক্রির টাকা কার্ডে বা মুঠোফোনের মাধ্যমে পরিশোধ করেন ক্রেতারা। আবার দারাজ, আজকের ডিল, ইভ্যালি, বাগডুমসহ অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতেও ঈদকেন্দ্রিক কেনাকাটা অনেক বেড়েছে। এসব প্ল্যাটফর্মে নগদের চেয়ে কার্ডে বা মুঠোফোনে বেশি অর্থ পরিশোধ হচ্ছে। 

ঈদে ক্রেতাদের জন্য বিশেষ ক্যাশব্যাক সুবিধা রেখেছে বিকাশ। বিকাশ এ বছর যে কোন কেনাকাটায় ৬৭টি ব্র্যান্ডের ৬০০টির বেশি দোকানে ২০ শতাংশ ক্যাশব্যাক দিচ্ছে। এ ছাড়া ডাচ-বাংলা ব্যাংকের রকেট মোবাইল পেমেন্ট ব্যবস্থায় নানা রকম সুবিধা আছে। 

বিকাশ কর্তৃপক্ষ জানায়, রমজান মাসে এ পর্যন্ত ব্যাংকের হিসাব থেকে দুই লাখ বার নিজের বিকাশ হিসাবে টাকা জমা করেছেন গ্রাহকেরা। আর গ্রাহকেরা ঈদের কেনাকাটায় ছয় লাখ বার অর্থ পরিশোধ করেছেন, যেটা গত ঈদে ছিল চার লাখ বার। এ বছর পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে প্রায় ৬৫০টি ফ্যাশন হাউস ও লাইফস্টাইল ব্র্যান্ডের ৪ হাজার ৩০০টির বেশি দোকানে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ক্যাশব্যাক সুবিধা দিচ্ছে বিকাশ। অনেক ই-কমার্স সাইট রয়েছে এই তালিকায়। সারা দেশে ছোট ছোট প্রায় ছয় হাজার মার্চেন্ট পয়েন্টে মিলছে ১ হাজার টাকার পেমেন্টে ৫০ টাকা ক্যাশব্যাক সুবিধা। সুপারশপগুলোতে ১ হাজার টাকার পণ্য কিনলে পাওয়া যাচ্ছে ১০০ টাকা ক্যাশব্যাক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের লেনদেনও বেড়েই চলেছে। শুধু এপ্রিল মাসেই ৩৪ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিল মাসে যথাক্রমে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩৪ হাজার ৬২৬ কোটি, ৩১ হাজার ৫১৩ কোটি, ৩৪ হাজার ৬৭৮ কোটি ও ৩৪ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এপ্রিলভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, দেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা ৬ কোটি ৮৩ লাখ। যা আগের মাসে (মার্চ) ছিল ৬ কোটি ৭৫ লাখ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে মোবাইলের সক্রিয় গ্রাহক রয়েছে ২ কোটি ৯১ লাখ। এপ্রিল মাসে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা লেনদেন করেছেন গ্রাহকরা। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মোট এজেন্ট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ২৮ হাজার ৫৬৩ জন। বর্তমানে ২৯টি ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অনুমোদন নিয়েছে। তবে কার্যক্রমে আছে ১৬টি ব্যাংক। 

You can share this post on
Facebook

0 মন্তব্য

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন ।