শিল্পপতিদের টাকা আত্মসাৎ করতে ক্যামেরুন থেকে বাংলাদেশে

news-details
ক্রাইম নিউজ

আমাদের প্রতিবেদক

বাংলাদেশি টাকাকে ডলারে রূপান্তরের নামের অভিনব প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল টাকা হাতিয়ে নেওয়া সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্রের তিন বিদেশি (ক্যামেরুন) নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যটালিয়ান (র‍্যাব)। এ সময় কথিত মেশিন ও প্রতারণার কাজে ব্যবহার করা নানা প্রকার সরঞ্জামাদিও উদ্ধার করেছে র‍্যাব।

আজ বুধবার বিকেলে র‍্যাব-৪ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানিয়েছেন। 

তিনি জানান,  সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে গতকাল মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর ধানমন্ডি ও বসুন্ধারা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে বিদেশি প্রতারকচক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা তিন জনই ক্যামেরুনের নাগরিক।

গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন- চিকামেন রডরিগ, ডংমেজা এন গুয়েংগি ও আলেক্সান্ডার মাফেজা।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রতারণা কৌশলের বর্ণনা দিয়ে র‍্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘অতিশয় ধূর্ত এইসব প্রতারণাচক্রের সদস্যরা প্রতারণাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে।  নিজেদের তীক্ষ মেধা, সুচিন্তিত পরিকল্পনা ও কর্মকৌশলের মাধ্যমে প্রতারণার পন্থাকে তারা শিল্পের পর্যায় নিয়ে গেছে। তাদের অভিনব কৌশলের কাছে প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন লোকও হার মানে। তাদের সুপরিকল্পিত সফল প্রতারণার পেশার মাধ্যমে অর্জিত অর্থের লোভ তাদের নিজ দেশ থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। তাদের একটি গ্রুপের প্রতিটি সদস্য সমানভাবে প্রতারণা কাজে দক্ষ হওয়ায় এই বিদেশী প্রতারণাচক্রের সদস্যরা সফলভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করে এই দেশের মানুষের সাথে প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করছে।’

র‍্যাব জানায়, তারা সাধারণত দুই ধরনের কৌশল কাজে লাগিয়ে টাকা আত্মসাত করেন।  প্রথম কৌশল : বিদেশি প্রতারকচক্রের এই সদস্যরা ভ্রমণ ভিসায় বাংলাদেশে আসে। এরপর তারা বাংলাদেশের গুলসান, বনানী, বারিধারাসহ অভিজাত এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে প্রতারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা করে। প্রথমে তারা বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির শিল্পপতি ব্যবসায়ীদেরকে লক্ষ্য করে কার্যক্রম শুরু করে। তারা ব্যবসায়ী বা শিল্পপতির অফিস কার্যালয় গিয়ে নিজেদেরকে তাদের দেশের বড় কোনো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, অংশীদার বা মালিক হিসেবে পরিচয় দেয়। কখনো বড় কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের পরিবারের পরিচালিত বলে দাবি করে উক্ত ব্যবসায়ী বা শিল্পপতির সাথে পরিচয় পর্বের পর তার সাথে অংশীদারী ব্যবসা পরিচালনার আগ্রহ প্রকাশ করে। বাংলাদেশি ব্যবসায়ী/শিল্পপতি উক্ত প্রতারণাচক্রের সদস্যদের সাথে অংশীদারী ব্যবসায়ে আগ্রহ প্রকাশ করলে তারা ব্যবসা সংক্রান্তে একটি চুক্তিপত্রের খসড়া তৈরি করতে বলে। চুক্তিপত্র করার নাম করে তারা কালক্ষেপণ করে। এ সময়ের মধ্যে তারা উক্ত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী/শিল্পপতির সঙ্গে কিছু সর্ম্পক গড়ে তোলে।

আলাপ আলোচনার এক পর্যায়ে তারা জানায় যে, তারা সাদা কাগজকে ডলারে রূপান্তর করতে পারে। উক্ত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী চাইলে টাকা ডলারে রূপান্তর করে দিতে পারে। প্রাথমিকভাবে অত্যন্ত সুকৌশলে উক্ত ব্যবসায়ীকে ডলারের লোভে ফেলে প্রতারণা কার্যক্রম শুরু করে।

দ্বিতীয় কৌশল :  প্রতারকচক্রের সদস্যরা বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে সাক্ষাতের কথা বলে। পূর্ব নির্ধারিত স্থানে উপস্থিত হয়ে তারা জানায় যে, ডলারে রূপান্তর করতে হলে এক হাজার টাকার নোট লাগবে। তারা উক্ত এক হাজার টাকা নোট পাউডার জাতীয় কেমিক্যাল মাখিয়ে ফয়েল পেপার দিয়ে মুড়িয়ে কস্টেপ দিয়ে শক্ত করে বাঁধে এবং একটি চতুর্ভূজ বান্ডিল আকৃতি তৈরি করে। এরপরে তারা তাদের সঙ্গে একটি বিশেষভাবে তৈরি দুই প্রকোষ্ট বিশিষ্ট বক্স সঙ্গে নিয়ে আসে যাহাতে বৈদ্যুতিক সংযোগে বিভিন্ন রংয়ের লাইটিং এবং বিশেষ ধরনের শব্দ সৃষ্টি করে। বক্সের ভেতরে বিশেষ প্রযুক্তিতে তৈরি মেশিনের কার্যক্রমের কারণে উক্ত লাইটিং এবং শব্দের মাধ্যমে টাকা ডলারে রূপান্তর হয় বলিয় জানায়। বান্ডিলগুলো উক্ত বক্সের ভেতর রাখে।

র‍্যাব আরও জানায়, এভাবেই প্রাথমিকভাবে বিশ্বাস অর্জনের জন্য ব্যবসায়ীর নিকট থেকে নেওয়া টাকার সমপরিমাণ ডলার উক্ত বক্সের ভেতরে রেখে বিশেষ কৌশলে চাতুর্যতার সঙ্গে ফেরত দেয়। উক্ত পন্থা অবলম্বন করে ব্যবসায়ীর বিশ্বাস অর্জন করে এবং পূর্বপরিকল্পিতভাবে ব্যবসায়ীকে লোভে ফেলে বড় অংকের টাকা ডলারে রূপান্তর করার জন্য প্রলুব্ধ করে।  যখন ব্যবসায়ী তাদের প্রস্তাবে রাজি হয়।  তখন তারা পূর্ব নির্ধারিত টাকার সমপরিমাণ আয়তনের একটি ফয়েল পেপারে মোড়ানো কসটেপ দ্বারা শক্তভাবে বাঁধা কাগজের বান্ডিল তাদের ডলার তৈরির বক্সের মধ্যে বিশেষভাবে তৈরি চেম্বারের বেতরে রেখে দেয়। তারা সেই বক্সসহ ব্যবসায়ীর কাছে আসে এবং তার কাছ থেকে পূর্ব নির্ধারিত টাকা নিয়ে পাউডার জাতীয় কেমিক্যাল মাখিয়ে একইভাবে ফয়েল পেপার দিয়ে মুড়িয়ে একই রংয়ের কসটেপ দ্বারা শক্তভাবে পেঁচিয়ে পূর্বের কাগজের বান্ডিলের সমআয়তনের একটি বান্ডিল তৈরি করে। তখন উক্ত বান্ডিলটি বক্সের ভেতরে রেখে চাতুর্যতার সঙ্গে সুকৌশলে প্রতারকচক্রের তৈরি করা কাগজের বান্ডিলটি রদবদল করে ব্যবসায়ীকে দেয় এবং ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত না খোলার জন্য নির্দেশ দেয়। টাকা ডলারে রূপান্তর হতে ২৪ ঘণ্টা সময় লাগবে বলে জানায় এবং আসল টাকা ও বক্সসহ কেটে পড়ে।

You can share this post on
Facebook

0 মন্তব্য

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন ।