স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে মশকনিধন কর্মীরা

news-details
জাতীয়

আমাদের প্রতিবেদক

মশকনিধন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি পালন করেন যারা ওষুধ ছিটানোর কর্মীরা। কীটনাশক ওষুধ দেওয়া থেকে শুরু করে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে কাজ করেন মশকনিধন কর্মীরা। কিন্তু সারা বছর খোদ নিজেরাই থাকেন স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে। 

জানা যায়, ঢাকা দুই সিটি করপোরেশনে প্রেষণে কাজ করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মশক নিবারণ অধিদপ্তর থেকে আসা মশকনিধন কর্মীরা। তবে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে মশকনিধন কর্মী রয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেরও (ডিএসসিসি)। 

সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা উত্তরে মোট মশকনিধন কর্মী আছেন ৯১৩ জন। এদের মধ্যে মশক নিবারণ অধিদপ্তর থেকে কাজ করছেন ২৮০ জন। আর দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করছেন ৬৩৩ জন। এই কর্মীদের দেখভালে আছেন ১৩ জন সুপারভাইজার। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণে কাজ করছেন ৩৭২ জন কর্মী। তবে অ্যাডহক ভিত্তিতে আরও কয়েকশ কর্মী আছে ডিএসসিসির।

আর এসব কর্মীরাই আছেন স্বাস্থ্যহানী ও রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে। মাঠ পর্যায়ে কর্মীদের কাজের ধরণ দেখে জানা যায়, মশার ওষুধ বিতরণের মেশিনে ওষুধ দেওয়ার আগে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ওষুধ মিশিয়ে থাকেন মশকনিধন কর্মীরা। একই সঙ্গে ফগার মেশিনের জ্বালানিও ভরেন তারা। এসময় হাতে গ্লাভস, মাথায় হেয়ার নেট পড়ার বিধান থাকলেও অনেক কর্মীই এসব পড়েন না। 

আবার বিভিন্ন মশক ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে যাওয়ার সময় পায়ে বড় বুট জুতা পরার কথা থাকলে সেটিও পড়েন না কর্মীরা। সিটি করপোরেশন বা মন্ত্রণালয় থেকে এসব উপকরণ দেওয়া হয় না বা দেওয়া হলেও সেগুলোর নিয়মিত সরবরাহ না থাকায় ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হয় বলে অভিযোগ করেছেন অনেক মশকনিধন কর্মী। 

মাঠ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন মশক কর্মী এবং সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বাস্থ্য ঝুঁকি সম্পর্কিত বিভিন্ন অভিযোগ এবং দাবি দাওয়া সিটি করপোরেশনের কাছে দিলেও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ঝুঁকি আছে জেনেও একরকম বাধ্য হয়েই কাজ করছেন তারা। 

ডিএনসিসির জোন-১ এর মশক কর্মীদের সুপারভাইজার মীর নজরুল ইসলাম বলেন, বড় স্যারেরা জানেন কিভাবে মশা মারতে হবে। তবে মশা মারার কাজটা আমরা মাঠে থেকে করি। অথচ আমাদের সমস্যা দেখার যেন কেউ নেই। আমাদের উন্নতমানের গ্লাভস নেই, মাস্ক নেই, হেয়ার নেট নেই। আমরা যে ওষুধ ব্যবহার করি সেগুলোতে আমরা নিজেরাও আক্রান্ত হই। 

‘একটা গ্লাভস দেয় ওয়ান টাইম, একবার খুলে ফেললে আর ব্যবহার করা যায় না। তখন খালি হাতেই ওষুধের মিশ্রণ তৈরি করতে হয়, মেশিনে অকটেন বা পেট্রল ভরতে হয়। এ সময় ওষুধ হাতে লাগলে হাতে ঘা হয়। কোনো কারণে মাথায় লাগলে চুল পড়ে যায়। আর যে মাস্ক আমাদের দেয় সেই মাস্কও ভালো না। ওষুধ আমাদের নাকেই ঢোঁকে।’ 

মাস্ক ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণভাবে কীটনাশক দিচ্ছেন মশকনিধন কর্মীরা। ফাইল ফটো  কোনোভাবে রোগে আক্রান্ত হলেও ছুটি পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ করেন এই সুপারভাইজার। 

তার অভিযোগ, ‘আমি নিজে আজ চার পাঁচদিন ধরে অসুস্থ, জ্বর। ছুটি চেয়েছিলাম পাইনি। এই জ্বরের শরীর নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় হেঁটে হেঁটে কাজ করতে হয়, অন্যের কাজ দেখতে হয়। ছুটি চাইতে গেলে স্যাররা উল্টো আরও ধমক দেন।’ 

অন্যদিকে রোগে আক্রান্ত হলে সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে কোনো রকম সাহায্য পাওয়া যায় না বলে জানিয়েছেন এক মশকনিধন কর্মী। 

চাকরি হারানোর ভয়ে কর্মস্থল এবং পরিচয় গোপনের শর্তে ওই মশকনিধন কর্মী বলেন, যেমন তেমন করে আমরা কাজ করি। কিন্তু আমরা রোগে আক্রান্ত হলে সিটি করপোরেশনের থেকে কোনো সাহায্য পাই না। বিশেষ করে চিকিৎসা পাই না। আমরা মন্ত্রণালয় থেকে আসলেও কাজ করি তো সিটি করপোরেশনের। 

‘আমাদের দেখভালের দায়িত্ব করপোরেশনের। প্রতি ওয়ার্ডে একজন করে ডাক্তার থাকলেও তাদের ধমকাধমকিতে ভাল করে রোগের কথা বলতেও পারি না। তাই বাইরে অন্য ডাক্তার দেখা হয়।’

অসুস্থ হয়ে অনেক কর্মীই আগে চাকরি ছেড়ে দেন বলে জানান এই কর্মী। তিনি বলেন, আমি কাজ করছি আজ ৯ বছর। ১৫ বছর কাজ করেই অনেকে আর কাজ করতে পারেন না। শরীর ছেড়ে (অসুস্থ হয়ে পড়ে) দেয়। আমার মতো ৯ বছরও কাজ করতে পারে না অনেকে। 

মশকনিধন কর্মীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং ঝুঁকি মোকাবেলায় সিটি করপোরেশনের গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে কথা বলতে রাজি হননি ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. শরীফ আহমেদ।

তবে ঝুঁকি মোকাবেলায় সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে দাবি করেছেন ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মোমিনুর রহমান মামুন। 

তিনি বলেন, মশকনিধন কর্মীদের এই ঝুঁকির বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। আমাদের কিছু প্রস্তাবনা আছে। তাদের খাবারের ব্যাপারে, ঝুঁকি ভাতার ব্যাপারে। মেয়র মহোদয়েরও নির্দেশ আছে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে কাজ করার। তবে কর্মীরা যখন কাজ করেন তখন কিছুটা ঝুঁকি থাকে। সত্যি কথা বলতে, মশা থেকে বাঁচতে কর্মীদের জন্য তো আর কোনো ধরনের পোশাক বা অন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। শুধু মশকনিধন কর্মীরা-ই নয় বরং হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স থেকে শুরু করে যারা সেবাধর্মী কাজের সঙ্গে যুক্ত সবারই ঝুঁকি আছে। আসলে সবাই ঝুঁকির মধ্যে থাকবে যেটাকে এড়ানোর কোনো উপায় নেই। আমাদের কর্মীরা এরপরও দারুণভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। 

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ডিএনসিসিতে কোনো মশকনিধন কর্মীর মৃত্যু হয়নি বলে জানিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, আমার এলাকায় এখন পর্যন্ত এমন কোনো কেস নাই। আর কোনো কর্মী রোগে আক্রান্ত হলে সিটি করপোরেশনের পক্ষে তার চিকিৎসার সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। 


 

You can share this post on
Facebook

0 মন্তব্য

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন ।