ব্রেকিং নিউজ

ফুটপাতের 'রাজা' ছিল যুবলীগ নেতা খুরশীদ

news-details
ক্রাইম নিউজ

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি

চট্টগ্রামের প্রধান প্রধান বাণিজ্যিক অফিস, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় বন্দরনগরী আগ্রাবাদে। এখানে রয়েছে দেশের প্রধান তিন তেল বিপণন প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা, যমুনার প্রধান কার্যালয়ও। ফলে এই এলাকাকে চট্টগ্রামের 'প্রাণ' হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন অনেকেই। বিপুল মানুষের আনাগোনার কারণে এখানকার বিশাল ফুটপাতকে ঘিরে গড়ে উঠেছে শত শত দোকানপাট। আর এসব দোকানপাট হয়ে উঠেছে সন্ত্রাসীদের অবৈধ আয়ের বড় একটি উৎস। 

পুরো আগ্রাবাদ এলাকার এক প্রকার 'নিয়ন্ত্রক' হয়ে ওঠেন যুবলীগ নেতা খুরশীদ আহম্মদ। এলাকার 'রাজা' হয়ে উঠতে তিনি গড়েছিলেন একটি বাহিনীও। আর সে বাহিনীর মাধ্যমে বেপরোয়া চাঁদাবাজি, মাদকের কারবার ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। তার কারণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন আগ্রাবাদ ও আশপাশ এলাকার সর্বস্তরের মানুষ। রোববার রাতে আগ্রাবাদে নিজের আখড়াতেই র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন সন্ত্রাসী খুরশীদ। এ খবর জানাজানির পর স্বস্তি নেমে আসে আগ্রাবাদ এলাকায়।

র‌্যাব-৭ এর লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মাহাবুবুল আলম সমকালকে বলেন, 'খুরশীদ আহম্মদ তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে মনির হোসেন হত্যা মামলাসহ অস্ত্র, চাঁদাবাজি, মাদকের আটটি মামলা রয়েছে। আগ্রাবাদ এলাকায় বেপরোয়া চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া তাকে ধরতে গিয়ে পুলিশও হামলার শিকার হয়েছিল। মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে ফুটপাতে হকার বসাতেন তিনি। প্রতিদিন তার সাঙ্গোপাঙ্গ হকারদের কাছ থেকে টাকা তুলত। তাদের ধরতে র‌্যাবের অভিযান অব্যাহত আছে।'

অনুসন্ধানে জানা গেছে, যুবলীগ নেতা খুরশীদ এক সময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল কাদের ওরফে মাছ কাদেরের অনুসারী ছিলেন। তার হাত ধরে অপরাধ জগতে প্রবেশ করেন তিনি। এর পর আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, অ্যাক্সেস রোড, শেখ মুজিব রোড, চৌমুহনী, পাঠানটুলী রোড, মোগলটুলী, কমার্স কলেজ রোড ও বার কোয়ার্টার এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেন। এসব এলাকায় নির্মাণাধীন ভবন, ফুটপাতের হকার, শিপিং অফিসে জাহাজের পরিত্যক্ত তেল সরবরাহ, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি, পিডিবি ও রাষ্ট্রায়ত্ত তিন তেল বিপণন প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। এসবের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে একাধিকবার মাছ কাদেরের সঙ্গে খুরশীদের দূরত্ব তৈরি হয়। সম্প্রতি দু'জনের মধ্যে এ নিয়ে বিরোধ চলছিল। পরে নিজেই একটি বাহিনী গড়ে তোলেন খুরশীদ।

ফুটপাত থেকে কোটি টাকার চাঁদাবাজি :আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার ফুটপাত ও সড়কের একাংশে প্রতিদিন বিকেলে তিন শতাধিক হকার বসেন। প্রতিটি ভ্যান ও ভাসমান দোকান থেকে এককালীন নেওয়া হয় ২০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। প্রতি মাসে প্রতিটি ভ্যান থেকে ভাড়া নেওয়া হয় দেড় হাজার; দোকানগুলো থেকে দুই হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার টাকা। বিদ্যুতের বাতির জন্য প্রতিদিন প্রতিটি দোকান থেকে নেওয়া হয় ৩০ থেকে ৫০ টাকা। এ ছাড়া পুলিশের নামেও করা হয় চাঁদাবাজি। পুলিশকে ম্যানেজ করার নামে প্রতি মাসে প্রত্যেক হকার থেকে তোলা হয় সাড়ে সাতশ' টাকা। খুরশীদের অনুমতি ছাড়া এখানে কেউ দোকান বসাতে পারতেন না। শুধু ফুটপাত থেকে তার আয় ছিল প্রায় দুই কোটি টাকা। খুরশীদের হয়ে এখানে দোকান থেকে চাঁদা তুলত শাহাদাত ও বাবলু নামে দুই যুবক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক হকার এসব তথ্য দিয়েছেন। গত রোববার খুরশীদের লাইনম্যান বাবলুর সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, 'আমার নিজেরও দোকান আছে এখানে। আমাকেও ভাড়া দিতে হয়। আমি শুধু হকারদের কাছ থেকে টাকা তুলে সমিতিতে জমা দিই। পুলিশ ম্যানেজ করা থেকে শুরু করে সব খুরশীদ ভাই করতেন। এখানে আমার কোনো লাভ ছিল না।'

হকারের কাছ থেকে পুলিশের নামে টাকা নেওয়া প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মাহাবুবর রহমান সমকালকে বলেন, 'খুরশীদ তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল পুলিশ। সুতরাং তাদের কাছ থেকে টাকার নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এ ধরনের অভিযোগ এ পর্যন্ত কেউ করেনি। এখন যেহেতু শুনেছি, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।'

কানা মান্নানকে নৃশংসভাবে খুন করেছিলেন খুরশীদ: ২০১৩ সালে নগরের হালিশহরে একটি গেস্ট হাউস দখল করতে গিয়ে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয় নগরের শীর্ষ সন্ত্রাসী মনির হোসেন ওরফে কানা মান্নান। এ ঘটনার আগে কানা মান্নান তার একটি পিস্তল আন্ডারওয়ার্ল্ডে তার সহযোগী ক্যাডার খুরশীদের কাছে রাখে। মান্নান জেলে যাওয়ার পর খুরশীদ পিস্তলটি ব্যবহার করে বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। জেলে থাকাকালে মান্নানের আধিপত্যের জায়গাগুলো দখল করে নেন তিনি। বেদখল হয়ে যায় তার মাদক স্পটগুলোও। মান্নান জেল থেকে বের হলে পিস্তল ফেরত নেওয়াকে কেন্দ্র করেও খুরশীদের সঙ্গে মনোমালিন্য হয়। কানা মান্নান তার আগের সহযোগী ক্যাডারদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজেই একটি গ্রুপ তৈরি করে আন্ডারওয়ার্ল্ডে তার আধিপত্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে। এতে শঙ্কিত হয়ে ২০১৪ সালের ২৯ জুন রাতে খুরশীদ তার অনুসারীদের নিয়ে কানা মান্নানকে খুন করে লাশ ফেলে দেন মোগলটুলি বাজারে। শরীর থেকে হাত বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয় তার। ক্ষতবিক্ষত করে ফেলা হয় পুরো শরীর। এ ঘটনায় খুরশীদ ও তার সহযোগীদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছিল।


 

You can share this post on
Facebook

0 মন্তব্য

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন ।