সচেতন হই, সুস্থ থাকি

news-details
ক্রাইম নিউজ

ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন সচেতন হই, সুস্থ থাকি আমাদের দেশের নারীরা নিজের স্বাস্থ্যের বিষয়ে তেমন একটা সচেতন নন। সমস্যা

 ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন

সচেতন হই, সুস্থ থাকি
আমাদের দেশের নারীরা নিজের স্বাস্থ্যের বিষয়ে তেমন একটা সচেতন নন। সমস্যা যতক্ষণ পর্যন্ত তীব্রতার শেষ বিন্দুতে না পৌঁছায়, শারীরিক যন্ত্রণা তারা লুকিয়েই রাখে। এভাবে কখন যে নীরব ঘাতককে শরীরে বাসা বাঁধতে দেয় বুঝে উঠতে পারে না। তেমনি একটি নীরব ঘাতক স্তন ক্যান্সার। 

অক্টোবর মাসটি স্তন ক্যান্সার সচেতনতার মাস হিসেবে পালিত হয় সারা বিশ্বেই। বাংলাদেশেও বিভিন্ন সংস্থা আয়োজিত সচেতনতার অনুষ্ঠানগুলোতে, বিভিন্ন পোস্টারে, লেখালেখিতে, টিভি অনুষ্ঠানে নানাভাবে এর সাড়া পাওয়া গেছে। ক্যান্সার চিকিৎসা ও প্রতিরোধ সংস্থাগুলোর অনুষ্ঠানে একটি গোলাপি রিবনের ছবি ও প্রতিকৃতি রয়েছে, যা স্তন ক্যান্সার সচেতনতার মাসের প্রতীক বা সিম্বল।

উন্নত বিশ্বে নারীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে স্তন ক্যান্সারকে দায়ী করা হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ১৮ লাখের বেশি নারী এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং প্রতি ১৩ মিনিটে একজন (অর্থাৎ বছরে প্রায় ৪০ হাজার) নারী মৃত্যুবরণ করছে। বাংলাদেশে আনুমানিক ২২ থেকে ২৫ হাজার নারী প্রতি বছর স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে বলে একটি সমীক্ষায় পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বিনা চিকিৎসায় বা অপ্রতুল চিকিৎসার জন্য মারা যাচ্ছে প্রায় ১৭ হাজার রোগী। একদিকে এ ক্যান্সারের আক্রমণ ও পরিণতির ভয়াবহতা যেমন সবাইকে আতঙ্কিত করে তোলে, অন্যদিকে তেমনি এ রোগ শুরুতে বা অঙ্কুরে শনাক্ত করা গেলে মৃত্যুর হার শূন্যের কোটায় নিয়ে আসার কথাও শোনা যায়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও সংশ্নিষ্ট সংগঠনগুলোর অভিমত তা-ই। দেখা গেছে, রোগীরা সাধারণত এমন পর্যায়ে চিকিৎসকের কাছে আসে, যখন কিছুই আর করার থাকে না। প্রাথমিক পর্যায়ে এ রোগ শনাক্তকরণ ও তা প্রতিরোধের উপায় নিয়ে আন্দোলনই হচ্ছে বিশ্বব্যাপী এ সচেতনতা প্রোগ্রামটির মুখ্য উদ্দেশ্য।

স্তন ক্যান্সারে নারীর মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। মেয়েদের ক্যান্সারের মধ্যে শতকরা ১৫ থেকে ২০ ভাগ হচ্ছে স্তন ক্যান্সার। আর এ সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। শতকরা ৬০ ভাগ রোগীরই বয়স ৩০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। এমনকি শতকরা ৫ ভাগের বয়স ৩০ বছরের নিচে। একটা সময় ছিল যখন এই ক্যান্সারের ব্যাপারে শুধু নারীদের সচেতনতা বৃদ্ধির ব্যাপারে জোর দেওয়া হতো। কিন্তু এখন পুরুষদেরও অধিক হারে সচেতন করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কারণ পুরুষদের মধ্যেও স্তন ক্যান্সার দেখা দিতে পারে। যদিও পুরুষদের স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হার খুবই কম। অন্যান্য ক্যান্সারের সঙ্গে স্তন ক্যান্সারের একটা বড় পার্থক্য হলো, সঠিক সময়ে ধরা পড়লে এবং সঠিক চিকিৎসা হলে এ রোগ থেকে সেরে ওঠার সম্ভাবনা প্রায় ৯০ শতাংশ। স্তন ক্যান্সার এমন একটি রোগ, যা চিকিৎসকের আগে রোগী নিজেই এই রোগ নির্ণয় ও ডায়াগনসিস করতে পারেন। একজন সচেতন নারী খুব সহজে ও দ্রুত এটি ধরে ফেলতে পারেন।

আমাদের দেশেও সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে গুটিকয় সংগঠন এই ক্যান্সার নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। এ কর্মসূচিকে সার্থক করার জন্য চিকিৎসকরা কিছু দিক নির্দেশনাও দিয়ে দিচ্ছেন :

নিজে নিজে স্তন পরীক্ষা 

একটি সহজ ও খরচাবিহীন পরীক্ষার মাধ্যমে উন্নত বিশ্বের প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ নারী তাদের স্তনের কোনো রোগকে একদম প্রাথমিক পর্যায়ে ধরে দিতে পারে। এ সহজ পরীক্ষাটি আপনি মাসে একবার গোসলের পর নিজেই করতে পারেন। প্রাক মেনোপজ গ্রুপ মাসিকের পর বা মাঝামাঝি সময় এবং মেনোপজে যারা গেছেন, তারা মাসের প্রথম বা শেষ দিনটিতে করতে পারেন।

কী দেখবেন

স্তনের আকৃতির কোনো পরিবর্তন হচ্ছে কি-না, ত্বকের রঙ ও বোঁটার পরিবর্তন, স্তনের ওপর ত্বক কমলালেবুর খোসার মতো কুঁচকে যাওয়া বা টোল পড়া, স্তনের বোঁটা থেকে রস পড়া, বোঁটার চারপাশে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া এবং স্তনের বোঁটা আস্তে আস্তে ভেতরে ঢুকে যেতে থাকা ইত্যাদি খেয়াল করতে হবে।

সন্দেহ হলে যথাযথ চিকিৎসকের কাছে পরীক্ষার জন্য যাবেন। চিকিৎসক প্রয়োজনে স্তনের হাই পাওয়ার এক্স-রে বা মেমোগ্রাফি বা সনোগ্রাফি করতে বলতে পারেন। মেমোগ্রাফি পরীক্ষাটি সাধারণত ৩৫ থেকে ৪০ বছরের নারীদের জন্য প্রতি তিন থেকে পাঁচ বছর অন্তর এবং ৪০ থেকে ৪৯ বছরের নারীদের ক্ষেত্রে প্রতি বছর করতে বলা হয়ে থাকে।

এ প্রসঙ্গে কিছু ঝুঁকির কথাও মনে রাখা দরকার। সেগুলো হচ্ছে-

-ক্যান্সার বা স্তন ক্যান্সারের পারিবারিক ইতিহাস।

-অল্প বয়সে মাসিক শুরু ও দেরিতে তা শেষ হওয়া।

-দেরিতে প্রথম সন্তান ধারণ।

-স্তনের কোনো রোগ বা জরায়ুর ক্যান্সার।

-কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া বয়সকালে হরমোন চিকিৎসা এইচআরটি নেওয়া।

-স্থূলাঙ্গী, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের রোগী।

-পারিপার্শ্বিক অবস্থা।

কীটনাশক, কলকারখানা, ইঞ্জিনের নির্গত গ্যাস ও ধোঁয়া, রাসায়নিক দূষিত পদার্থ দ্বারা পানি ও খাদ্য সংক্রমণ।

প্রতিরোধের দুটি উপায়

শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো : শিশুর এ জন্মগত অধিকার মা ও শিশুকে আরও নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ করে। মা তার শিশুকে কমপক্ষে দুবছর বয়স পর্যন্ত বুকের দুধ পান করাবেন। এর ফলে দুজনই নানা রোগ থেকে রক্ষা পেয়ে থাকে।

খাদ্যাভ্যাস ও দৈনন্দিন জীবন প্রণালি : জীবনযাপন হতে হবে সহজ, অনাড়ম্বর ও শৃঙ্খলার। হালকা ব্যায়াম করে শরীরটাকে সতেজ রাখুন। মদ, তামাক ও গুরুপাক চর্বিযুক্ত খাবার বাদ দিয়ে দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় যোগ করুন প্রচুর শাকসবজি, রঙিন মৌসুমি ফল। মাছ ও সয়াজাতীয় খাবার ক্যান্সার প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। কেননা এতে আছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও ফাইটো কেমিক্যাল, যা রোগ প্রতিরোধে সহায়ক।

স্তন ক্যান্সার সচেতনতায় যে ধারণাটি দেওয়া জরুরি তা হলো, এটি কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। স্তন ক্যান্সার হওয়া মানেই মৃত্যু নয়, তবে প্রাথমিক অবস্থায় সঠিক নিরূপণ ও চিকিৎসার প্রয়োজন।

তাই দ্বিধা-সংকোচ থেকে মুক্ত হয়ে আজ থেকেই স্তন পরিচর্যায় যত্নশীল ও সতর্ক হোন। এতে আপনার অনেক সংকট শুরুতেই কেটে যেতে পারে। আসুন, আমরা সচেতনতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এ মরণব্যাধিটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলি।

সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান 
ক্যান্সার ইপিডেমিওলজি বিভাগ
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট

You can share this post on
Facebook

0 Comments

If you want to comment please Login. If you are not registered then please Register First