ব্রেকিং নিউজ

ম্যাজিস্ট্রেট নাজিমের অমানুষিক নির্যাতনের বর্ণনা দিলেন রিগ্যান

news-details
দেশজুড়ে

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

‘সেদিন শুক্রবার (১৩ মার্চ) রাত ১২টা পার হয়ে গেছে। তখন ঘুমানোর জন্য শুয়েছি মাত্র। হঠাৎ করে শুনতে পেলাম বাড়ির ভিতরে বুটের শব্দ। কেউ ডাক দিলো আরিফ ভাই দরজা খোলেন। কে ডাকছেন বলতেই, বললো আমরা থানা থেকে আসছি। বিস্মিত হয়ে সাথে-সাথে সদর থানার ওসি সাহেবকে ফোন দিলাম। তিনি কোনো পুলিশ পাঠাননি বলে জানালেন। ফোনে কথা বলতে শুনে দরজায় লাত্থি দিয়ে ছিটকিনি ভেঙে ঘরে ঢুকে আরডিসি নাজিম উদ্দিন মাথায় অনেকগুলি কিলঘুষি মারলো। লাত্থি মারলো। তারপর কিলঘুষি মেরে টেনে হেঁচড়ে ঘর এবং বাড়ি  থেকে বাইরে নিয়ে গিয়ে মাইক্রোবাসে উঠালো। তারপর বললো- তোকে আজ এনকাউন্টারে দেয়া হবে। তুই বেশি বেড়ে গেছিস। তুই এই সমাজের জঞ্জাল। সাংবাদিকতা তোকে শেখাবো। এই বলে হাত-পা-চোখ বেঁধে অকথ্য গালিগালাজ করতে করতে অজ্ঞাত স্থানে এনকাউন্টার করার জন্য নিয়ে যায়। আমি তখন অনেক কাকুতি মিনতি করি। আল্লাহ’র ওয়াস্তে ক্ষমা চাই। শেষে আমার দুই সন্তানের কসম দেই। আমার ছোট ছোট দু’টি বাচ্চা আছে। আমার বাবা-মা নেই। আমি মারা গেলে আমার সন্তানদের দেখবে কে। তারপরও তিনি খুব টর্চার করেন।

এরপর ওই জায়গা থেকে ঘুরিয়ে এনে চোখ খুলে দিলে দেখতে পাই-আমি ডিসি অফিসে। এখানে এনে আমাকে আবারও মারধর করা হয়। জোর করে ৪টি কাগজে সই নেয়। আমাকে বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করেছে।এরপর রাতের মধ্যে গাড়িতে করে কারাগারে রেখে এসেছে। কোন অপরাধে আমাকে নিয়ে আসা হয়েছে-বারবার জিজ্ঞাসা করা সত্ত্বেও তারা আমাকে কিছু বলেনি।’ 

রোববার (১৫ মার্চ) দুপুর ১টার দিকে কুড়িগ্রাম জেলা সদরের জেনারেল হাসাপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থা কাঁদতে কাঁদতে এভাবেই গত শুক্রবার (১৩ মার্চ) মধ্যরাতে তার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার দুঃসহ স্মৃতির বর্ণনা দিচ্ছিলেন অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিগ্যান (৩৮)।

এর আগে সকাল ১১টার দিকে তার জামিন মঞ্জুরের মাত্র ২০ মিনিটের মাথায় তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দেয়া হয়। তার জামিন নিয়েও ঘটেছে নানা নাটকীয় ঘটনা। কে তার দন্ডের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন-কে তার জামিন আবেদন করেছেন এ নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে।

রিগ্যানের মামা নবীদুল ইসলামসহ অন্য স্বজনরা জানিয়েছেন, আপিল এবং জামিনের আবেদন বিষয়ে পরিবারের কেউ কিছু জানেন না। সকালে জামিন হওয়ার কথা শুনে তারা বিস্মিত হন।

তবে আরিফুল ইসলাম রিগ্যান বলেছেন, শনিবার রাতে কারাগারে আপিল ও জামিন আবেদনের জন্য ওকালতনামা ও জামিনের জন্য বেলবন্ড নিয়ে গিয়ে বলা হয়েছে এগুলো স্বাক্ষরের জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছে। এ কথা শুনে স্বাক্ষর করেছি। 

এ বিষয়ে পাবলিক প্রসিকউিটর এসএম আব্রাহাম লিংকন জানান, রোববার (১৫ মার্চ) সকালে জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের দেওয়া দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন এবং জামিনের আবেদন দাখিল করা হলে তা গ্রহণ করা হয়। এরপর শুনানির জন্য আবেদনগুলো অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানো হয়। সকাল ১১টার বাজার ৫ মিনিট আগে শুনানি শুরু হয়। এরপর ১১টার দিকে ২৫ হাজার টাকার বন্ডে এবং একজন আইনজীবী ও প্রেস ক্লাবের সভাপতির জিম্মায় তাকে আপিলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জামিনে মুক্তি দেয়ার আদেশ দেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সুজাউদ্দৌলা।

এ সময় রিগ্যানের পক্ষে তিনি নিজে এবং অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন ও আহাসান হাবীব নীলু অংশগ্রহণ করেন। অ্যাডভোকেট আহসান হাবীব নীলু প্রেস ক্লাবের সভাপতি।

তিনি আরো বলেন, আপিল আবেদন ও জামিন আবেদনে সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগ্যান স্বাক্ষর করেছেন এবং তা সত্যায়িত করেছেন জেলার। আর ভ্রাম্যমাণ আদালতের দণ্ডের আবেদনে পরিবারের কারো স্বাক্ষর করার বিধান নেই। শুধু দন্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি আবেদন করতে পারেন। এজন্য রিগ্যানের স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। 

এদিকে, জেনারেল হাসপাতালের অর্থোপেডিক ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অরিফুল ইসলাম রিগ্যানের বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে অর্থোপেডিক বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. ইউকে রায় জানান, রিগ্যানের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। পরীক্ষা-নীরিক্ষা চলছে।

রিগ্যানের স্ত্রী মোস্তারিমা সরদার নিতু, মামা নুর ইসলাম নুরু, নজরুল ইসলাম ও নবীদুল ইসলাম জানান, জেলা প্রশাসকসহ জেলা প্রশাসনের যেসব কর্মকর্তা নির্যাতনের সাথে জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। এছাড়া রিগ্যান সুস্থ হওয়ার পর নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। 

 অন্যদিকে জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহার করায় জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আহ্বায়ক শ্যামল ভৌমিক তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, শুধু জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহার করলে হবে না। তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সেইসঙ্গে জড়িত অন্যান্য কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

 এ প্রসঙ্গে প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান বিপ্লব বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে জেলা প্রশাসকসহ জড়িত অন্য কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

অন্যদিকে, একাধিকবার চেষ্টা করেও জেলা প্রশাসক মোছা. সুলতানা পারভীন ও সেদিনের ঘটনায় জড়িত ম্যাজিস্ট্রেটদের সাথে কথা বলে তাদের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

গত শুক্রবার মধ্যরাতে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা, রেভিনিউ ডিপুটি কালেক্টর (আরডিসি) নাজিম উদ্দিন ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট এসএম রাহাতুল ইসলাম- এই ৩ জন ম্যাজিস্ট্রেট সহ টাক্স ফোর্সের সদস্যরা জেলা সদরের কৃষ্ণপুর চরুয়াপাড়া এলাকার বাড়িতে গিয়ে আরিফুল ইসলাম রিগ্যানকে জোরপূর্বক জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাকে মাদক মামলায় এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে কারাগারে পাঠিয়েছিলেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

You can share this post on
Facebook

0 মন্তব্য

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন ।