ক্রিকেট-ফুটবল খেলে আর বাড়ি মাতাবে না জায়ান

news-details
জাতীয়

।।নিজস্ব প্রতিবেদক ।।

ক্রিকেট-ফুটবল দুটি খেলাই পছন্দ ছিল ৮ বছরের শিশু জায়ানের। পুরো নাম জায়ান চৌধুরী। বিকেল হলেই ব্যাট-বল হাতে চলে যেত বাসার নিচে। অন্য সঙ্গীদের (কেয়ারটেকার) সঙ্গে খেলা শেষে সন্ধ্যার আগেই উঠতো বাসায়। জায়ান মায়ের সঙ্গে থাকত নানার বাসায়। মা শেখ সোনিয়া চৌধুরীর পাশাপাশি জায়ানের সবচেয়ে ভালোলাগার মানুষ ছিল নানি ফাতেমা চৌধুরী। নানা আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিমও তার কম পছন্দের নন। শান্ত ঠাণ্ডা মেজাজের জায়ান পড়ার সময় পড়া, খেলার সময় খেলা, দুষ্টুমির সময় দুষ্টুমি। বেড়াতে যাওয়ার সময় বেড়ানো। স্কুলেও যেত নিয়মিত। এই ছিল তার নিত্য রুটিন। গুলশান সানবীম স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে পড়ত জায়ান। গত বৃহস্পতিবার বাবা-মায়ের সঙ্গে বেড়াতে যায় শ্রীলঙ্কায়। ফেরার কথা ছিল গতকাল সোমবার। কিন্তু তার একদিন আগেই শ্রীলঙ্কায় এক আত্মঘাতী বোমা হামলা কেড়ে নেয়
তার জীবন। ওই হামলায় গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন জায়ানের বাবা মশিউল হক চৌধুরী প্রিন্স।

জানা গেছে, জায়ান সোমবার না ফিরলেও ফিরছেন আগামী কাল বুধবার। তবে জীবিত নয়, নিথর দেহ নিয়ে। সবাইকে কাঁদিয়ে। বনানীর নানার বাড়ি, যেখানে জায়ানের বেড়ে ওঠা। সেই বাড়িটিতে তার পরনের পোশাক থেকে শুরু করে খেলার ব্যাট-বল, বই, খাতা, কলম সবকিছুই আছে আগের মতো। হয়তো সেগুলো স্মৃতি হিসেবেই পড়ে থাকবে। বাবা-মা, প্রিয় মানুষ নানা-নানিসহ খেলার সঙ্গীদের ছেড়ে নির্জন কবরের বাসিন্দা হয়ে থাকবে জায়ান। আর কোনোদিন পড়াশোনা করবে না সে। যাবে না তার প্রিয় স্কুলেও। খেলবে না তার প্রিয় খেলা ক্রিকেট-ফুটবল। আর খাওয়া হবে না ছোট্ট জায়ানের প্রিয় খাবার ফেঞ্চফ্রাই।

জায়ানের মৃত্যুর খবর দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়লেও বুকের ধন জায়ান কেমন আছে, কোথায় আছে তা এখনো জানতে পারেননি মা শেখ সোনিয়া। বোমা হামলায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি বাবা মশিউল হক চৌধুরী প্রিন্স। বনানীর বাসাটিতেও এখন সুনসান নীরবতা। আগের মতো সরগরম না থাকলেও নানা শেখ ফজলুল করিম সেলিম ও নানি ফাতেমা চৌধুরীসহ পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিতে আসছেন সরকারের মন্ত্রী ও দলের অনেক নেতা। আসছেন শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠজন। গতকাল দিনভর ওই বাসার নিচে কুরআন খতম করছিলেন কয়েকজন হাফেজ। নাতিকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ নানি। নানা শেখ সেলিম খবর শোনার পর থেকেই গতকাল পর্যন্ত ছিলেন নিশ্চুপ। কারো সঙ্গেই তেমন কোনো কথা বলছেন না তিনি। এখন অপেক্ষা আদরের নাতি জায়ানের লাশের জন্য।

এদিকে শুধু ঢাকাতেই নয়, মায়ের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জে বেড়াতে গেলে সেখানে জায়ানের খেলার সঙ্গী শেখ মলির ছেলে শেখ ওয়াসিফ। সোমবার থেকেই ওয়াসিফের সঙ্গে জায়ানের খেলার বেশকিছু ছবি ভাইরাল হচ্ছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। নানা শেখ সেলিমের মামাতো বোন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ভালোবাসতেন নাতি জায়ানকে। জায়ান প্রায়ই মায়ের সঙ্গে গণভবনে এসে দেখা করে যেত নানি শেখ হাসিনার সঙ্গে। জায়ানকে প্রধানমন্ত্রীর আদরের কয়েকটি ছবিও দেখা গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। শেখ ওয়াসিফের মা শেখ মলি গতকাল ভোরের কাগজকে জানান, জায়ান ছিল খুব শান্ত ও ঠাণ্ডা মেজাজের ছেলে। সে গুলশান সানবীম স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ত। বেড়াতে গিয়ে জায়ান লাশ হয়ে ফিরবে সেটা কখনো ভাবতে পারিনি। তার নানা-নানির অত্যন্ত আদরের ছিল জায়ান। গত বৃহস্পতিবার বাবা-মায়ের সঙ্গে শ্রীলঙ্কা বেড়াতে গিয়েছে। বাবা-মায়ের সঙ্গে আজ (সোমবার) দেশে ফেরার কথা ছিল। গোপালগঞ্জে নানা বাড়িতে বেড়াতে এলেই আমার ছেলের সঙ্গে জায়ান খেলাধুলা করত। জায়ান সম্পর্কে বলতে গিয়েই একপ্রকার বাকরুদ্ধ হয়ে যান শেখ মলি।

জানা গেছে, গত রবিবার শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ বোমা হামলায় মারা যায় ছোট্ট জায়ান। ঘটনার সময় বাবা মশিউল হক চৌধুরী প্রিন্স তাকে সঙ্গে নিয়ে হোটেলের নিচে ব্রেকফাস্ট করতে যান। এমন সময় হোটেলটিতে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় মারা যায় জায়ান। বাবা মশিউল হক চৌধুরী গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

শেখ সেলিমের বাসার বিপরীতে ১০ নম্বর বাসার গাড়িচালক জাহিদ বিলাপ করে বলেন, ছেলেটা মারা যাওয়ার খবর শুনে খুব খারাপ লাগছে। বাসার কেয়ারটেকারের সঙ্গে সে ক্রিকেট খেলত। মাঝেমাঝে একা একা সে ফুটবলও খেলত। অনেক সময় বল বাসার বাইরে রাস্তায় চলে আসত। আমি সে বল কুড়িয়ে আবার ভেতরে পাঠাতাম। ছেলেটা প্রতিদিন বিকেল হলেই বল ও ব্যাট নিয়ে নিচে নেমে বাসার কেয়ারটেকারদের সঙ্গে খেলত।
জায়ানের মরদেহ আসছে কাল : এদিকে খবর শোনার পরপরই পরিবারের পক্ষ থেকে শ্রীলঙ্কায় যোগাযোগ করা হয়। সেখানে বাংলাদেশের হাইকমিশনও সার্বক্ষণিক তদারক করে তথ্য জানাচ্ছেন। আগামীকাল বুধবার সকাল ১১টায় জায়ানের লাশ দেশে আসছে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ। এরপর বনানী চেয়ারম্যান বাড়ি মাঠে জানাজা শেষে বাদ আসর বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।

এ বিষয়ে সবধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। গতকাল বেলা ১১টায় শেখ সেলিমের সঙ্গে দেখা করে বেরিয়ে যাওয়ার সময় জায়ানের মৃত্যুর সংবাদ নিশ্চিত করে শিল্পমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন বলেন, শ্রীলঙ্কার ঘটনা খুবই মর্মান্তিক। এটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তারপরও আমরা এসেছি শেখ সেলিমকে সান্ত্বনা দিতে। শেখ সেলিমের নাতি জায়ান মারা গেছে কিন্তু জামাতা এখনো নিরাপদ আছেন। তবে তার দুটি পা ড্যামেজ হয়ে গেছে। মন্ত্রী আরো বলেন, জায়ানের মা সোনিয়াও এখন পর্যন্ত জানেন না যে তার ছেলে নেই। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি দেখছেন। শ্রীলঙ্কার সরকারের সঙ্গে কথা হচ্ছে। আমাদের হাইকমিশনের লোকজন যোগাযোগ করছেন।

এর আগে গতকাল সকাল পর্যন্ত জায়ানের মৃত্যু নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে কিছু জানানো হয়নি। রবিবার শ্রীলঙ্কায় হামলার পর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এক ব্রিফিংয়ে বলেছিলেন, বোমা হামলার ঘটনার পর থেকে এক শিশুসহ দুই বাংলাদেশির খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে তাদের নাম-পরিচয় সে সময় প্রকাশ করেননি তিনি। এরপর ব্রুনাই সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে প্রবাসীদের দেয়া এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তার বক্তব্যে নিজের স্বজনদের বোমা হামলার শিকার হওয়ার কথা প্রথম জানান। সেখানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শেখ সেলিমের মেয়ে, জামাই ও দুই বাচ্চা নিয়ে শ্রীলঙ্কায় ছিল। সেখানে মেয়ের জামাই প্রিন্স, ছেলে সাড়ে আট বছর.. ওরাও গিয়েছিল.. রেস্টুরেন্টে, সেখানে বোমা পড়েছে। জামাই আহত হাসপাতালে, বাচ্চাটার এখনো কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না যে সে কোথায় আছে। আপনারা একটু দোয়া করেন, যেন ওকে পাই।

You can share this post on
Facebook

0 মন্তব্য

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন ।