ব্রেকিং নিউজ

স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাচলের পরামর্শ দিলেও বাস্তবে সম্ভব হচ্ছে না

news-details
জাতীয়

আমাদের প্রতিবেদক :

করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাব থেকে সুরক্ষা পেতে সরকার সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ওপর। কিন্তু গণপরিবহন থেকে শুরু করে ফুটপাতে চলাচলে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা নিয়ে প্রতিনিয়ত বিড়ম্বনায় পড়েছেন মানুষ। 

করোনার বিস্তার রোধে ফুটপাতে মানুষের চলাচলে শারীরিক দূরত্বের বিষয়ে হেলথ অ্যান্ড হোপ স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান করা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা হয়নি। জনগণ ফুটপাতে চলাচলে গাঁয়ের সঙ্গে ঘেঁষে চলাচল করছেন। দেশে স্বাস্থ্যবিধি বা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মত অবস্থা নেই। 

সরেজিমনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, করোনা মহামারিতে সরকার জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাচলের পরামর্শ দিলেও বাস্তবে তা সম্ভব হচ্ছে না। চাকরি রক্ষার জন্য ঘর ছেড়ে বাইরে বের হলেই স্বাস্থ্যবিধির নিয়মনীতির যেন কোন বালাই মিলছে না। ফুটপাতে হকারদের রাজত্বে অসহায় পথচারীরা। করোনার এই মহামারির সময়েও মানুষের চলাচলে স্বস্তি মিলছে না। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ব্যস্ততম এলাকা সদরঘাট, শাঁখারী বাজার, তাঁতীবাজার ও লক্ষ্মীবাজার ফুটপাত হকারদের দখলে থাকায় মানুষ এখন রাস্তা দিয়ে চলাচল করছেন। এতে এদিকে যেমন প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটছে, অন্যদিকে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছে। গুলিস্তানের ফুটপাতের অবস্থা আরও খারাপ। ফুটপাত দখলে চলে যাওয়ায় হকার ও পথচারীদের গাঁয়ের সঙ্গে গাঁ লাগিয়ে চলছেন মানুষ।

জানা গেছে, রাজধানীসহ দেশের বিভাগীয় ও জেলা শহরের ফুটপাত হকারদের দখলে থাকায় পথচারীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ইচ্ছা থাকার পরেও মানতে পারছেন না। বিশেষ করে ঘনবসতীপূর্ণ ঢাকা দুই সিটি করপোরেশন ফুটপাত হকারদের দখলে চলে গেছে। এই শহরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে নিয়ে আনতে পারছে না সরকার।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ফুটপাতের চিত্রের সঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ফুটপাতের চিত্র একই। মিরপুর ১ নম্বর গোল চক্কর থেকে মিরপুর মাজারগেট ও উত্তরা আব্দুল্লাপুর থেকে উত্তরা জসিমুদ্দিনের সামনে পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে ফুটপাত দখল করে আছে হরেক রকমের অসংখ্য দোকান। এসব দোকানে কেনাকাটা করতে প্রতিনিয়ত ভিড় করছেন ক্রেতারা। বিশেষ করে মেয়েরা বেশি ভিড় করে থাকেন। এসব ফুটপাতের দোকান বিকেল হলে সকালের তুলনায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। পর্যাপ্ত জায়গা না পেয়ে সড়কে চলাচল করছেন পথচারীরা। এসব দোকানের ময়লা-আবর্জনা সড়ক ও ফুটপাতে ছড়িয়ে আছে। সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত রাস্তা দখল করে রমরমা ব্যবসা চালানো হচ্ছে। বিকেল ৪টার পর থেকে হকারদেও ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠে। 

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা (উপ-সচিব) মো. রাসেল সাবরিন বলেন, সিটি করপোরেশন প্রতিনিয়ত বিভিন্ন এলাকার ফুটপাত দখল মুক্ত করছে। যদিও স্বল্প পরিসরে অভিযানগুলো চালানো হচ্ছে। তবে ফুটপাত দিয়ে পথচারী যেন স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারেন সেজন্য আগামীতে ব্যাপক পরিসরে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

নগরপরিকল্পনাবিদরা বলছেন, হকারদের পুনর্বাসন করে সরিয়ে দিতে হবে। এছাড়া সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ সত্ত্বেও ফুটপাত থেকে হকাদের সরানো যাবে না। কারণ ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার হকার উচ্ছেদ করেছে সিটি করপোরেশন। কিন্তু শেষমেষ দেখা গেছে হকারদের স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি। কারণ পুলিশ ও প্রশাসনের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা হকারদের সাহায্য করে। তাদের সহায়তার কারণে ফুটপাত ও রাস্তা থেকে হকারদের উচ্ছেদ করার পরও তারা আবারও দখল করে নেয়।  

হকারদের উচ্ছেদের পেছনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মদদ রয়েছে বলে মনে করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরশনের ১৩ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. এনামুল হক। 

তিনি  বলেন, ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদে স্থানীয় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা চেয়ে কয়েক ধাপে চিঠি দিয়েছি, কিন্তু সহযোগিতা পায়নি। গুলিস্তানে দায়িত্বে থাকা কয়েকজন পুলিশ সদস্য নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক শর্তে বলেন, হকারদের ক্ষমতা জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ফুটপাত থেকে হকারদের উচ্ছেদ করছেন পরক্ষণেই জনপ্রতিনিধিরা হকারদের ফুটপাতে বসিয়ে দিচ্ছেন।

গুলিস্তানে ফুটপাতে জুতা বিক্রি করছেন আশরাফুল তালুকদার। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ফুটপাতে হকারি করছেন। ফুটপাতে দোকান বসানোর জন্য স্থানীয় নেতাদের মোটা অংকের টাকা দিয়েছেন। আর এখন লাইনম্যানকে দৈনিক ২০০ টাকা টোল দেন। আশরাফুল বলেন, গুলিস্তানে দোকানের চেয়ে ফুটপাতে পণ্য বেশি বিক্রি হয়। এ জন্য দোকানিরাও নিজেদের পণ্য নিয়ে ফুটপাতে বসেন।  

সায়েদাবাদ এলাকার বাসিন্দা সুজন মিয়া বলেন, ক্রমবর্ধমান যানবাহন ও জনসংখ্যার চাপে রাজধানীর জনজীবন চরমভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে। এ দুর্ভোগ নগরবাসীর নিত্যদিনের। তবে রাজধানীর ফুটপাত দখলে এ দুর্ভোগে যেন আরো তীব্র হয়েছে। যানজটে নাকাল রাজধানীবাসী হেঁটে গৌন্তব্যে পৌঁছাতে চাইলেও তা পারছেন না। পথচারীদের ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করছে প্রভাবশালীরা।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও উত্তর সিটি করপোরেশন ফুটপাতে অবৈধ দখল ও দোকান উচ্ছেদের পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও তেমন একটা কার্যকর হচ্ছে না। একদিকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হচ্ছে অন্যদিকে পরক্ষণেই আবার সেগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে। উচ্ছেদের দিন বিকেলেই বা পরদিন আবার তা দখল করা হচ্ছে। ভেঙে ফেলা সব দোকান আবার নতুন করে গড়ে তুলছেন দখলদাররা।

ফুটপাত থেকে হকারদের উচ্ছেদ অভিযানের বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, সিটি করপোরেশন ঢাকঢোল পিটিয়ে উচ্ছেদ অভিযান চালায়। তারপরও দখলমুক্ত হচ্ছে না রাজধানীর ফুটপাত। কারণ হকারদের পেছনে প্রভাবশালীদের চাঁদাবাজি ও হকারদের কর্তৃত্ব বহাল রয়েছে। বারবার উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পরও ফুটপাত মুক্ত রাখতে না পারার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবকে দায়ী করছেন ড. আদিল মুহাম্মদ খান।


 

You can share this post on
Facebook

0 মন্তব্য

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন ।